আইন-আদালত

উদ্ধার হওয়া ম্যাগাজিন আলামত হিসেবে গণ্য, দুই আসামির স্বীকারোক্তি

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে। মামলার প্রধান আসামির স্বজনের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি ম্যাগাজিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলামত হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে এ ঘটনায় গ্রেফতার দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদের বোন জেসমিনের ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি ম্যাগাজিনকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এই আদেশ দেন।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুর আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটে পল্টন থানাধীন বিজয়নগর বক্স কালভার্ট রোডের ডিআর টাওয়ারের সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি (৩৩)। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। সেখানে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।

তদন্তে উঠে আসে, এ ঘটনায় র‍্যার-২ পরিচালিত অভিযানে জব্দ তালিকা-২ অনুযায়ী পশ্চিম আগারগাঁওয়ের একটি বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া আলামতগুলো সরাসরি হত্যা মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সে কারণে জিডির মাধ্যমে সংযুক্ত জব্দ তালিকা-২ অনুযায়ী উদ্ধারকৃত আলামতকে হাদি হত্যা মামলার আলামত হিসেবে গণ্য করা একান্ত প্রয়োজন।

গত ১৫ ডিসেম্বর র‍্যাব-২ অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের বোন জেসমিনের ভাড়া বাসা থেকে লোহার গ্রিলের ওপর রাখা দুটি ম্যাগাজিন ও একটি চাকু উদ্ধার করে। তদন্তে জানা যায়, ঘটনার দিন ১২ ডিসেম্বর ফয়সাল করিম মাসুদ একটি কালো কাঁধের ব্যাগ নিয়ে ওই বাসায় যান। পরে ২৩ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিএদিকে একই হত্যা মামলায় গ্রেফতার আসামি সঞ্জয় চিসিম ও মো. ফয়সাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন এবং পরে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদের আবেদনের ভিত্তিতে আসামিরা স্বেচ্ছায় দায় স্বীকারে সম্মত হওয়ায় আদালত তাদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন।

এর আগে ১৫ ডিসেম্বর হালুয়াঘাট সীমান্ত এলাকা থেকে মানবপাচারকারী হিসেবে পরিচিত সঞ্জয় চিসিম ও সিমিরন দিওকে আটক করে বিজিবি। পরবর্তীতে তাদের এই হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ১৮ ডিসেম্বর প্রথম দফায় তিন দিন এবং ২১ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। দুই দফা রিমান্ড শেষে ২৬ ডিসেম্বর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর ৩০ ডিসেম্বর তৃতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।

অন্যদিকে ১৬ ডিসেম্বর র‍্যাব-১১ নরসিংদী থেকে মো. ফয়সালকে আটক করে। পরে তাকে অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয় এবং ৩০ ডিসেম্বর হাদি হত্যা মামলায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করা হলে সঞ্জয় ও ফয়সাল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন, আর সিবিয়নকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এ পর্যন্ত ওসমান হাদি হত্যা মামলায় মোট ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পাশাপাশি চারজন সাক্ষীর জবানবন্দিও রেকর্ড করা হয়েছে।

গ্রেফতার হওয়া অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা মো. হুমায়ুন কবির, মা মোসা. হাসি বেগম, স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, বান্ধবী মারিয়া আক্তার, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ, রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ী মো. নুরুজ্জামান নোমানী, মোটরসাইকেলের মালিক মো. কবির ও আমিনুল। এদের মধ্যে ফয়সালের বাবা-মা, স্ত্রী, বান্ধবী, শ্যালক ও আমিনুল আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে শরিফ ওসমান হাদির মাথায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর ওসমান হাদিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার তার মৃত্যু হয়।

১৯ ডিসেম্বর হাদির মরদেহ দেশে আনা হয়। শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিসৌধের পাশে শরিফ ওসমান হাদিকে দাফন করা হয়।

ঘটনায় গত ১৪ ডিসেম্বর রাতে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। ওসমান হাদি মৃত্যুবরণ করলে যা হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়া হয়।

এমডিএএ/এমআইএইচএস