আন্তর্জাতিক

ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধে নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন খোদ ইসরায়েলই

ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন যুদ্ধের ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মহল। টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ এখন মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে আরেক দফা সংঘাত হলে ইসরায়েল আগের চেয়ে ‘কম প্রস্তুত’ অবস্থায় পড়তে পারে।

এই উদ্বেগের মূল কারণ হলো- ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি, যা গত বছরের জুনে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় এখন আরও বড় আকার ধারণ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সর্বশেষ সামরিক সংঘাতের ব্যাপ্তি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির প্রকৃত মাত্রা তুলে ধরতে পারেনি। তবে তাতেই এই হুমকি মোকাবিলায় ইসরায়েলের ব্যবহৃত বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

একদিকে তেহরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুনর্গঠন ও আধুনিকীকরণের কাজে এগিয়ে চলেছে, অন্যদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের গুরুতর ঘাটতি ও উৎপাদনে দীর্ঘ সময় লাগার মতো সমস্যার মুখে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে ক্ষেপণাস্ত্র সংঘর্ষের ধরনকেই ‘মৌলিকভাবে’ বদলে দিতে পারে।

এমন প্রেক্ষাপটেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানে দ্বিতীয় দফা হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই তথ্য জানায়।

তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউজে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ তুলে ধরেন। পাশাপাশি লেবাননে হিজবুল্লাহর দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

অ্যাক্সিওসের বরাতে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, আলোচনায় ২০২৬ সালে ইরানের ওপর আবারও হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়েও কথা হয়েছে। এটি হবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট ও ইরানের মধ্যে গত জুনে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের প্রায় ছয় মাস পর। ওই যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে জুনের ওই হামলাগুলোকে ‘অত্যন্ত সফল’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করে, যুক্তরাষ্ট্র আবারও তা ধ্বংস করে দেবে।

এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন করতে ‘বাস্তব ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ’ নেয়, সেক্ষেত্রে ট্রাম্প নতুন সামরিক অভিযানে সমর্থন দিতে পারেন। তবে ‘পুনর্গঠন’ বলতে কী বোঝানো হবে, তা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোই হবে সবচেয়ে বড় টানাপোড়েনের বিষয়।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েল আবারও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে ও লেবাননে হিজবুল্লাহ নতুন দীর্ঘ পাল্লার অস্ত্র মজুত করছে বলে অভিযোগ তুলেছে। এর জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যে কোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ‘কঠোর’ প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘সম্মানের পরিবেশে’ আবারও আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন।

মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবিষ্যতে সামরিক পদক্ষেপের সময়সীমা বা নির্দিষ্ট সীমা নিয়ে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো যায়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরও। হোয়াইট হাউজ অ্যাক্সিওসকে ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্যের দিকেই ইঙ্গিত করেছে।

গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে বাংকার-বাস্টার বোমা ব্যবহার করে হামলা চালায়। এই হামলা আসে ইসরায়েলের আকস্মিক অভিযানের এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর, যেখানে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীরা নিহত হন ও কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের বিষয়েও এগিয়ে যেতে সম্মত হয়েছেন ও হামাস নিরস্ত্র হতে ব্যর্থ হলে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

গাজা বোর্ড অব পিস আগামী ২৩ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিযানে গাজায় ৭১ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত ও ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, বিধ্বস্ত এই ভূখণ্ড পুনর্গঠনে আনুমানিক ৭০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে।

সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

এসএএইচ