দুর্বৃত্তদের আগুনে পুড়ে মারা যায় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তার বিনতি (৮)। এবার তার তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল। দ্বিতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফলও হয়েছে। রোল নম্বর ২২ থেকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে সে। তবে আয়েশার শুধু নামটুকুই থেকে গেছে। নিজের সাফল্যও দেখে যেতে পারেনি সে। তার এমন সাফল্যে অভিভাবক, সহপাঠী ও শিক্ষকদের মুখে হাসি ফোটার কথা থাকলেও এখন সবার চোখ অশ্রুসিক্ত।
দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও তৃতীয় শ্রেণির কক্ষে আয়েশাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। রোল ২ ডাকার সঙ্গে সঙ্গে আয়েশা আর বলে উঠবে না প্রেজেন্ট স্যার। কারণ সে আর নেই। দুর্বৃত্তের আগুনে নিভে গেছে ছোট্ট শিশুটির জীবন প্রদীপ।
স্থানীয় ফাইভ স্টার স্কুলের প্রধান শিক্ষক নোমান সিদ্দিকী বলেন, আয়েশ খুব মেধাবী ছিল। সে মেধাতালিকায় এবার দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে তার রোল ছিল ২২, তৃতীয় শ্রেণিতে হয়েছে ২। কিন্তু সেতো আর নেই। তার ফলাফল দেখে এখন সবার চোখে পানি।
বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের তিন মেয়ের মধ্যে আয়েশা সবার ছোট। তার বড় মেয়ে সালমা আক্তার স্মৃতিও (১৮) একই আগুনে পুড়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। বেলাল লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও স্থানীয় সূতারগোপ্তা এলাকার সার-কীটনাশক ব্যবসায়ী।
অভিযোগ রয়েছে, গত ১৯ ডিসেম্বর রাতে দুর্বৃত্তরা বাইরে থেকে দুটি দরজায় তালা মেরে পেট্রল ঢেলে বেলালের বসতঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে ঘরে থাকা ছোট্ট আয়েশা পুড়ে মারা যায়৷
জানা গেছে, পাকা ভিটির টিনশেড ঘরের তিনটি কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন বেলাল হোসেন, তার স্ত্রী নাজমা বেগম, তিন মেয়ে ও দুই ছেলে৷ আগুন লাগার পর বেলাল তার স্ত্রী, চার বছর বয়সী ছেলে নাজমুল ইসলাম, চার মাস বয়সী ছেলে নজরুল ইসলাম, বড় মেয়ে স্মৃতি ও মেজো মেয়ে সামিয়া আক্তারকে ঘরের টিনের বেড়া উঁচু করে কোনো রকমে বের করতে পেরেছিলেন। আকুতি শুনেও আগুনের তীব্রতায় আয়েশার কাছে যেতে পারেননি তারা, সবার চোখের সামনেই আগুনে পুড়ে মারা যায় আদরের কন্যা।
ঘটনার সময় শরীরের ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয় বড় মেয়ে সালমার। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৫ ডিসেম্বর রাতে তার মৃত্যু হয়।
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৫ ডিসেম্বর মুঠোফোনের মাধ্যমে বিদেশে থাকা এক প্রবাসীর সঙ্গে সালমার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু শ্বশুর বাড়িতে যাওয়া হয়নি তার। আগুনে তার শ্বাসনালিসহ শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। শরীরে এমন কোনো জায়গা ছিল না, যেখানে দগ্ধ হয়নি।
এক আগুনে দুই মেয়েকে হারিয়ে বেলাল হোসেন ও নাজমা বেগম দম্পতি শোকের সাগরে নিমজ্জিত। মেজো মেয়ে সামিয়ার শরীরের ২ শতাংশ পুড়ে যায়, প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেও তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়নি৷
রোববার রাতে আয়েশার বাবা বিএনপি নেতা বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমার মেয়েটাতো নেই। যখন শিক্ষক তার ফলাফলের কথা জানিয়েছে, তখন বুকফাটা কান্না ছাড়া আর কিছুই আমার নেই। ফলাফল দিয়ে এখন আমি কী করবো। আমার দুটি সন্তান একসঙ্গে পুড়ে মারা গেছে।’
তিনি আরও বলেন, পুরো ঘর ছাই হয়ে গেছে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তিনি এখন ভাইয়ের ঘরের বারান্দায় থাকছেন।
লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়াহিদ পারভেজ বলেন, বেলাল বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেছেন। মামলাটি তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় এখনো কেউ আটক নেই।
কাজল কায়েস/এফএ/এমএস