দেশজুড়ে

দুয়ারে নির্বাচন, বাঁধের কাজ নিয়ে শঙ্কায় হাওরের কৃষকরা

সুনামগঞ্জের ৯৫টি হাওরে শুরু হয়েছে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ। নামমাত্র এই কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৩ কোটি টাকা। তবে প্রতিবছরের মতো এ বছরও নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ শুরু হলেও নিয়ম অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ হবে কি না সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় ৩ হাজার ৭৪৭.১৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সুনামগঞ্জ। যার এক তৃতীয়াংশ মানুষ হাওরে ধান উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করে। বিশেষ এই জেলায় প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ওপরে ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। যে ধান ঘরে তুলতে কৃষকদের নানা প্রতিকূলতা পার করতে হয়।

বিশেষ করে ২০১৭ সালে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় কৃষকদের সোনালী ধান। যে ধানের পাশে বসে কান্নায় তখন ভেঙে পড়ে পুরো হাওরবাসী। সেই কান্নায় তখন শিহরিতো হয় পুরো বাংলাদেশ। এমনকি ধস নামে জেলার অর্থনীতিতে। এরপরই হাওরের ঠিকাদারি প্রথা বাদ দিয়ে বাঁধ নির্মাণে তৈরি হয় নতুন নীতিমালা। জেলা প্রশাসনের কার্যালয় ও জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্মিলিতভাবে হাওরের বাঁধের পাশে যে কৃষকের জমি রয়েছে তাদের মাধ্যমে বাঁধ তৈরির নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।

তবে ২০১৭ সালের পর প্রতিবছর সেই নীতিমালা অনুযায়ী হাওরে বাঁধ নির্মাণ হলেও সেটি কতটুকু মানসম্পন্ন সেই তথ্য কেবল জানার পালা।

এই যেমন কালনার হাওরের কৃষক কেদু মিয়া। ২০১৭ সালের পাহাড়ি ঢলে হাওরের বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় তার কষ্টের ফসল। সেই থেকে যখনই ওই হাওরে বোরো ধানের বীজ রোপন করেন, তখন থেকে তার চোখে মুখে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা থাকে। বিশেষ করে বছরে বছরে বাঁধ নির্মাণ নিয়ে তার রয়েছে বিরাট তিক্ততা। নামমাত্র এই বাঁধ নির্মাণ কিংবা সংস্কারে অন্যরা লাভবান হলেও কৃষকদের যেন চিন্তা কমছে না।

কৃষক কেদু মিয়া জাগো নিউজকে জানান, ৪০ হাজার টাকা খরচ করে এ বছর বোরো ধানের চাষাবাদ করতে মাঠে নেমেছি। প্রতিবছর বাঁধ নির্মাণে দেরি হয়। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে আবার নির্বাচন। আমরা কৃষকরা বড় দুশ্চিন্তায় আছি।

শুধু কেদু মিয়া নয়, একই অবস্থা জেলার ১৩ লাখ কৃষকের। বিশেষ করে অন্যান্য বছর এই সময়ে জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বাঁধের দিকে সর্বোচ্চ নজর দিয়েও নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় গত পাঁচ বছরে অকাল বন্যায় হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ৬০০ কোটি ২০ লাখ টাকার ধান তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় বাঁধের কাজ কতটুকু মানসম্পন্ন হবে, সেই চিন্তায় পড়েছেন হাওর অঞ্চলের কৃষকরা।

হাওরের কৃষক লাল দুলাল জাগো নিউজকে বলেন, আমরা এ বছর অনেক দুশ্চিন্তায় আছি হাওরের বাঁধ নিয়ে। একদিকে নির্বাচন, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে বাঁধের সঠিক কাজ হবে কি না সেটা নিয়ে শঙ্কায় হাওরের কৃষকরা।

হাওরের কৃষক সুলতান মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, অন্য বছর এই সময়ে হাওরের বাঁধের কাজ অনেকটা হয়ে যায়, অথচ এ বছর বাঁধ নির্মাণ নিয়ে কারো যেন মাথাব্যথা নেই।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সুনামগঞ্জের ৯৫টি হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় ৫৯০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজ শুরু হয় গত ১৫ ডিসেম্বর। যা ৫১০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে করা হবে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জাগো নিউজকে বলেন, এখনো জেলার ১২ উপজেলায় হাওরের পানি না কমায় শতভাগ কাজ শুরু করতে পারেনি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি। সেইসঙ্গে কাজে অনিয়ম হলে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

আর সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, নির্বাচনে বাঁধের কাজে প্রভাব পড়বে না। কারণ আমরা দুটিকে সমানভাবে প্রাধান্য দেব।

এফএ/এমএস