বিশ্ব রাজনীতি আবার এক অনিশ্চিত অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব ধারণা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রেখেছিল যেমন: সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন, বহুপাক্ষিকতা—সেগুলো একে একে প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে গ্রিনল্যান্ড। একটি জনবিরল, বরফাচ্ছন্ন দ্বীপ। কিন্তু কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে যার গুরুত্ব আজ বৈশ্বিক।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, “২০ দিন পর থেকে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ভাবব।” এটি নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এটি একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক হুমকি। সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া এই বক্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির ভাষার প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গভীর রাতে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা এখনো বিশ্বকে নাড়া দিচ্ছে। একটি সার্বভৌম দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে বিদেশি সেনা অভিযানের মাধ্যমে তুলে নিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে একটি বিপজ্জনক নজির। এই ঘটনার মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে ট্রাম্পের হুমকি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। এটি কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র নয়। আবার পুরোপুরি উপনিবেশও নয়। ১৯৫৩ সাল থেকে এটি ডেনমার্কের সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ। ২০০৯ সালে গ্রিনল্যান্ডকে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেওয়া হয়। এমনকি ভবিষ্যতে গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়ার সাংবিধানিক অধিকারও রয়েছে তাদের। কিন্তু কোনো তৃতীয় রাষ্ট্রের চাপ বা হস্তক্ষেপের সুযোগ আন্তর্জাতিক আইন দেয় না।
ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র। ফলে গ্রিনল্যান্ডও ন্যাটোর নিরাপত্তা ছাতার আওতায় পড়ে। এই বাস্তবতায় একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্য শুধু ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ঐক্যকেও চ্যালেঞ্জ করে।
এটি প্রথমবার নয়। ২০১৯ সালেই ট্রাম্প প্রথম গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন বিশ্ব বিস্মিত হয়েছিল। ডেনমার্ক সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতৃত্বও তা নাকচ করে দেয়। সেই ‘না’ আজ যেন নতুন করে আগ্রাসী ভাষায় ফিরে এসেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন গ্রিনল্যান্ড? কেন এখন?
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো নিরাপত্তা ও ভূকৌশল। আর্কটিক অঞ্চল দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলছে। নতুন নৌপথ উন্মুক্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চল হয়ে উঠছে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন—সবাই এখানে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।
গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত পিটুফিক স্পেস বেস যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার সামরিক তৎপরতা, বিশেষ করে পারমাণবিক সাবমেরিনের চলাচল নজরদারি করা সম্ভব। এছাড়া গ্রিনল্যান্ড–আইসল্যান্ড–ব্রিটেন জলপথ, যা GIUK Gap নামে পরিচিত, রাশিয়ার নৌবাহিনীর জন্য একটি প্রধান প্রবেশপথ। এই জলপথের উপর নিয়ন্ত্রণ মানেই উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে সামরিক প্রভাব বিস্তার।
দ্বিতীয় বড় কারণ হলো প্রাকৃতিক সম্পদ। গ্রিনল্যান্ডকে ভবিষ্যতের খনিজ ভাণ্ডার বলা হয়। এখানে রয়েছে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। ইউরোপীয় কমিশন যে ৩৪টি ‘গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল’ চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে ২৫টিই গ্রিনল্যান্ডে পাওয়া যায়। এর মধ্যে লিথিয়াম ও গ্রাফাইট উল্লেখযোগ্য, যা আধুনিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য অপরিহার্য।
আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। কোনো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার সেই অঞ্চলের জনগণের। শক্তি প্রয়োগ করে ভূখণ্ড দখল আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই নীতিই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ঘটনা সেই ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে সামরিক অভিযান চালিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানকে গ্রেপ্তার করা হলে, সেই দৃষ্টান্ত অন্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগের আশঙ্কা তৈরি হয়। গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বক্তব্য সেই আশঙ্কাকেই বাস্তব রূপ দিচ্ছে।
বিশ্ব যখন সবুজ অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে, তখন এই সম্পদগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক শক্তির নির্ধারক হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, বরং ভবিষ্যৎ শিল্প ও প্রযুক্তির চাবিকাঠি।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—সম্পদ ও কৌশলগত গুরুত্ব থাকলেই কি দখল বৈধ হয়ে যায়? আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্টভাবে বলে, না।
আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। কোনো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার সেই অঞ্চলের জনগণের। শক্তি প্রয়োগ করে ভূখণ্ড দখল আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই নীতিই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল।
কিন্তু ভেনেজুয়েলার ঘটনা সেই ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে সামরিক অভিযান চালিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানকে গ্রেপ্তার করা হলে, সেই দৃষ্টান্ত অন্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগের আশঙ্কা তৈরি হয়। গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বক্তব্য সেই আশঙ্কাকেই বাস্তব রূপ দিচ্ছে।
এই ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধে রাশিয়া, ইরান, কিউবা, মেক্সিকোসহ একাধিক দেশ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো এই ঘটনাকে ল্যাটিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর বক্তব্যে একটি বড় সত্য প্রতিফলিত হয়েছে—এই ধরনের পদক্ষেপ গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে একটি স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। মাদক দমনকে অজুহাত করে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়াকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। নাম না করেই অন্যান্য রাষ্ট্রনায়কদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় গ্রিনল্যান্ড ইস্যু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। যেখানে আন্তর্জাতিক আইন নয়, শক্তিই শেষ কথা।
এই প্রবণতা বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ ছোট ও মধ্যম রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা মূলত আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। শক্তির একতরফা প্রয়োগ যদি বৈধতা পায়, তবে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। আমরা আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির ওপর আস্থা রাখি। শক্তির রাজনীতি যদি নিয়মে পরিণত হয়, তবে ছোট দেশগুলোর কণ্ঠ আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
গ্রিনল্যান্ড আজ একটি প্রতীক। এটি আইন বনাম আগ্রাসনের প্রতীক। সহযোগিতা বনাম আধিপত্যের প্রতীক। আজ যদি গ্রিনল্যান্ডে এই হুমকি সফল হয়, কাল অন্য কোনো অঞ্চল একই পরিণতির মুখে পড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—বিশ্ব কি এই আগ্রাসী স্বপ্নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে? নাকি ইতিহাস আবার প্রমাণ করবে যে শক্তিই শেষ সত্য? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থা।
লেখক : গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
এইচআর/এমএস