কৃষি ও প্রকৃতি

শীতে আলুর মড়ক রোগ হলে চাষিদের করণীয়

ডিপ্লোমা কৃষিবিদ জিয়াউল হক

আলুর লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোগ অন্যতম একটি ক্ষতিকারক রোগ। প্রথমে পাতা, ডগা ও কাণ্ডে কিছু অংশ ঘিরে ফেলে। বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশি থাকলে ২-৩ দিনের মধ্যে জমির অধিকাংশ ফসল আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ভোরের দিকে আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো ছত্রাক চোখে পড়ে। আক্রান্ত ক্ষেতে পোড়া-পোড়া গন্ধ পাওয়া যায় এবং মনে হয় যেন জমির ফসল পুড়ে গেছে। মড়ক রোগের আক্রমণে ক্ষতির পরিমাণ আলুর জাত, গাছের বয়স, রোগ আক্রমণের সময়, আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে। প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এ রোগের আক্রমণে আলুর ফলন সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হতে পারে।

সম্প্রতি আলুর লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোগ প্রতিরোধে কৃষকদের আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং থেকে জারি করা এক সতর্কবার্তায় বলা হয়, শীতকালীন এই মৌসুমে আলুর লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোগ মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। এমতাবস্থায় ফসল রক্ষার্থে কৃষকদের আগাম করণীয় পালন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়কালে আলুর মড়ক রোগের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। যে কোনো সময় নিম্ন তাপমাত্রা (রাতে ১০-১৬ ডিগ্রি এবং দিনে ১৬-২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং কুয়াশাচ্ছন্ন অর্দ্র আবহাওয়ায় (আর্দ্রতা ৯০% এর বেশি) এ রোগ বিস্তার ঘটে। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার সাথে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলে এ রোগ ২-৩ দিনের মধ্যে মহামারি আকার ধারণ করে। বাতাস, বৃষ্টিপাত ও সেচের পানির সাহায্যে এ রোগের জীবাণু আক্রান্ত গাছ থেকে সুস্থ গাছে দ্রুত বিস্তার লাভ করে।

মড়ক রোগের লক্ষণ আলুর লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোগের আক্রমণ প্রথমে গাছের গোড়ার দিকে পাতায় ছোপ-ছোপ ভেজা হালকা সবুজ গোলাকার বা বিভিন্ন আকারের দাগ দেখা যায়, যা দ্রুত কালো রং ধারণ করে এবং পাতা পচে যায়। সকালবেলা মাঠে গেলে আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো জীবাণু দেখা যায়। ঠান্ডা ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় আক্রান্ত গাছ দ্রুত পচে যায়। এ অবস্থায় ২-৩ দিনের মধ্যেই ক্ষেতের সব গাছ মরে যেতে পারে। রোগে আক্রান্ত আলুর গাছে বাদামি থেকে কালচে দাগ পড়ে এবং খাবার অযোগ্য হয়ে যায়।

আরও পড়ুন১৮ কাঠায় ২৬ সবজি, মেহেরপুরে কৃষক আবুল কালামের অনন্য সাফল্য হলুদ ফুলে দুলছে কৃষকের রঙিন স্বপ্ন 

মড়ক রোগ দমনে করণীয় এ রোগ হওয়ার পূর্বেই কৃষকদের করণীয় সম্পর্কে বলা হয়, রোগের অনুকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার সাথে সাথে রোগ প্রতিরোধের জন্য ৭ দিন পর পর অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করে গাছ ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে।

যদি এরই মধ্যে ফসল রোগে আক্রান্ত হয়ে যায়, তবে জমিতে সেচ বন্ধ করা এবং ৪-৫ দিন পর পর অনুমোদিত ছত্রাকনাশক সঠিক মাত্রায় স্প্রে করতে কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

এ ছাড়া নিজের বা পাশের ক্ষেতে রোগ দেখা মাত্রই ৭ দিন অন্তর অন্তর (ম্যানকোজেব ৬০% + ডাইমেথোমর্ফ ৯%) ২ গ্রাম অথবা (ম্যানকোজেব ৫০% + ফেনামিডন ১০%) ২ গ্রাম অথবা (প্রোপিনেব ৭০% + ইপ্রোভেলিকার্ব) ২ গ্রাম, (কার্বেনডাজিম ৫০%) যে কোনো একটি গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক পর্যায়ক্রমে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করে গাছ ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। রোগের প্রাদুর্ভাব খুব বেশি হলে ৩-৪ দিন অন্তর ছত্রাকনাশকের মিশ্রণ স্প্রে করতে হবে।

ছত্রাকনাশক স্প্রে করার সময় হাত মোজা, সানগ্লাস, মাস্ক ও অ্যাপ্রোন ব্যবহার করতে হবে। সব সময় বাতাসের অনুকূলে স্প্রে করতে হবে। ছত্রাকনাশকের বোতল, প্যাকেট অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় জিনিস মাটিতে পুতে ফেলতে হবে। জমিতে স্প্রে করার পর সরঞ্জাম ও শরীর ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। সাবান দিয়ে শরীর, হাত, পা ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।

লেখক: ডিপ্লোমা কৃষিবিদ ও উদ্যোক্তা, চাষী সেবা।

এসইউ