শিক্ষা

সরকারঘোষিত ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ৫ দাবি

রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় সরকারঘোষিত ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করেছে হতাহতদের পরিবার। তারা আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বিচার, শহীদি মর্যাদা, পুনর্বাসনসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

এসময় নিহত নাজিয়া ও নাফির বাবা আশরাফুল ইসলাম বলেন, গত বছরের ২১ জুলাই তারিখটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনকি বিশ্ব ইতিহাসেও একটি শোকাবহ ও বেদনাবিধুর দিন। এদিন দুপুর ১টা ১২ মিনিটে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। যার ফলে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঘটনাস্থলে ব্যাপক প্রাণহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটে, যাদের অধিকাংশই স্কুলের কোমলমতি ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক ও শিক্ষিকা।

তিনি বলেন, এই ভয়াবহ মানব সৃষ্ট দুর্ঘটনায় সেই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানের পাইলট এবং আমাদের নিষ্পাপ শিশুসন্তানসহ মোট ২৮ জন ছাত্রছাত্রী, তিনজন অভিভাবক, তিনজন শিক্ষিকা ও একজন পরিচারিকা মর্মান্তিক মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। এছাড়াও ১৭২ জন কমবেশি আহত হয়।

‘এ ঘটনায় আমি আমার দুই সন্তান নাজিয়া-নাফিকে হারাই। এছাড়াও উসাইমং মারমা তাদের একমাত্র সন্তান ও রেজাউল করিম তাদের একমাত্র পুত্রসন্তানকে হারিয়ে এখন নিঃসন্তান। কেউ কেউ নির্বংশ হয়েছেন,’ যোগ করেন আশরাফুল ইসলাম।

তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের দাবি, স্থানীয় ছাত্র-জনতার দাবি, হাইকোর্টের রুল ও উপদেষ্টাদের মৌখিক প্রতিশ্রুতি আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি।’

আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে আমাদের লিখিত দাবিগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর বা প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শহীদ পরিবারকে ২০ লাখ এবং আহতদের ৫ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিলে আমরা শহীদ ও আহত পরিবার ১৪ ডিসেম্বর তা প্রত্যাখান করি। পরবর্তীতে গত ২৯ ডিসেম্বর জানতে পারি, প্রত্যেক শহীদ পরিবারকে সর্বোচ্চ এক কোটি এবং প্রত্যেক আহতদের জন্য সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি উপদেষ্টাদের সভায় উপস্থাপন করা হবে। আমরা শহীদ পরিবার এই ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখান করছি।’

পাঁচ দফা দাবি

ন্যায়বিচার: তদন্ত প্রতিবেদনে পাইলটের উড্ডয়নজনিত ত্রুটি, মানে বিমানবাহিনীর ত্রুটি এবং বিল্ডিং কোড অনুযায়ী স্কুল ভবন না করার কারণে হতাহতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো উপস্থাপন করছে যে বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধানের দুর্নীতির কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নান (অব.) তিন হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন। মূলত, এই দুর্নীতির ফলে দুর্ঘটনায় পাইলটসহ ৩৬ জন শহীদ এবং ১৭২ জন আহত হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, এই দুর্নীতির টাকা উদ্ধার করে পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। এছাড়া মাইলস্টোন স্কুল কর্তৃপক্ষ বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন না করার কারণে হতাহতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদেরও শাস্তি এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের অনুরোধ করা হয়। তাহলেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ন্যায়বিচার পাবে এবং ভবিষ্যতে কেউ দুর্নীতি বা অনিয়ম করবে না।

আর্থিক ক্ষতিপূরণ: ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতের লক্ষ্যে উচ্চ আদালতে রিটের রুল অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিতে আবেদন জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। যাতে পরিবারগুলো এই অর্থের কিছু সদকায়ে জারিয়া হিসেবে জনস্বার্থে ব্যয় করতে পারে। অর্থ দিয়ে কখনো জীবনের মূল্য হয় না। তবুও উল্লেখিত অর্থে সন্তানদের জন্য কিছু করতে পারলে তারা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।

শহীদি মর্যাদা দেওয়া: যেসব শিশু মৃত্যুবরণ করেছে তাদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য একটি সৌধ নির্মাণ এবং সবাইকে শহীদি মর্যাদা ও সনদ দিয়ে সে অনুযায়ী সব সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

স্মৃতি রক্ষায় পদক্ষেপ: এই ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতি সংরক্ষণে প্রতি বছর ২১ জুলাইকে জাতীয় শিক্ষা শোক দিবস ঘোষণা করে উত্তরাতে একটি আধুনিক মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ ও শিশুদের কবর স্থায়ীভাবে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

পুনর্বাসন: শহীদ পরিবারকে প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

কেআর/একিউএফ/এএসএম