মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপি আরও দুর্বল হয়েছে। বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দিন শেষে রুপির মান ৭ পয়সা কমে এক ডলারের বিপরীতে ৮৯ দশমিক ৯৪ রুপিতে লেনদেন শেষ করেছে। উচ্চ অপরিশোধিত তেলের দাম, টেকসই বিদেশি তহবিলের বহির্গমন ও শক্তিশালী ডলারের চাপে এমনটি ঘটেছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
ফরেক্স বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন শুল্ক আরোপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ এবং দেশীয় শেয়ারবাজারে দুর্বল মনোভাবও রুপির ওপর চাপ তৈরি করেছে। ইন্টারব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে বৃহস্পতিবার রুপি দিনের শুরুতে প্রতি ডলার ৮৯ দশমিক ৯৬ রুপিতে লেনদেন শুরু করে। দিনের মধ্যে সর্বনিম্ন ৯০ দশমিক ১৩ ও সর্বোচ্চ ৮৯ দশমিক ৭৩ রুপিতে ওঠানামার পর শেষে রুপি আরও দুর্বল অবস্থানে লেনদেন শেষ করে।
ফিনরেক্স ট্রেজারি অ্যাডভাইজার্স এলএলপির ট্রেজারি প্রধান ও নির্বাহী পরিচালক অনিল কুমার ভানসালি পিটিআইকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মাত্র ১০ বেসিস পয়েন্টও শুল্ক বাড়ায়, তাহলে ভারতের রপ্তানি বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে। তার ভাষায়, এতে মনোভাব বদলে যাবে- ‘চুক্তি আসছে’ থেকে ‘আবার শুরুর জায়গায় ফিরে যাওয়া’তে। ভানসালির ধারণা, শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রুপি ৮৯ দশমিক ৮০ থেকে ৯০ দশমিক ৩০ রুপির মধ্যে লেনদেন করতে পারে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি ঘিরে অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে ভারতের শেয়ারবাজারেও। বৃহস্পতিবার ভারতের প্রধান শেয়ার সূচকগুলো চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় একদিনের পতনের মুখে পড়েছে। ভারী ওজনের রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার দর কমে যাওয়ায় বাজারে ব্যাপক বিক্রির চাপ তৈরি হয়।
নিফটি ৫০ সূচক ১ দশমিক ০১ শতাংশ কমে ২৫ হাজার ৮৭৬ দশমিক ৮৫ পয়েন্টে এবং সেনসেক্স ০ দশমিক ৯২ শতাংশ পড়ে ৮৪ হাজার ১৮০ দশমিক ৯৬ পয়েন্টে বন্ধ হয়। চলতি সপ্তাহে নিফটি ও সেনসেক্স যথাক্রমে ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ১ দশমিক ৮ শতাংশ হারিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) লেনদেনে ১৬টি প্রধান খাতের সবকটিতেই দরপতন হয়েছে। স্মল-ক্যাপ ও মিড-ক্যাপ সূচক উভয়ই ২ শতাংশ করে কমেছে।
শুল্ক সংক্রান্ত উদ্বেগ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক অর্থ প্রত্যাহারের প্রভাবে রুপির দরপতন হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আকস্মিক হস্তক্ষেপকেও ছাপিয়ে গেছে। চলতি জানুয়ারি মাসে এখন পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৯০০ মিলিয়ন বা ৯০ কোটি ডলারের শেয়ার বিক্রি করেছেন। এর আগে ২০২৫ সালে তারা রেকর্ড ১৯ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৯০০ ডলারের শেয়ার বিক্রি করেছিলেন।
আরিহান্ত ক্যাপিটাল মার্কেটসের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসার প্রধান অনিতা গান্ধী বলেন, শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তায় বাজার স্বস্তিতে নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের কথা বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি ভারতকে বাড়তি শুল্ক আরোপেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ভারতের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসিয়েছে। উল্লেখ্য, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা ভারত বর্তমানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত একটি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে।
রপ্তানিনির্ভর পোশাক প্রস্তুতকারক গোকুলদাস এক্সপোর্টসের শেয়ার ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ও পার্ল গ্লোবালের শেয়ার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। একইভাবে সামুদ্রিক খাবার রপ্তানিকারক অ্যাভান্তি ফিডসের শেয়ার ৮ দশমিক ৬ শতাংশ ও অ্যাপেক্স ফ্রোজেনের শেয়ার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ পড়ে গেছে।
ধাতু খাতের শেয়ারগুলো ৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমে গেছে, যা নয় মাসের মধ্যে একদিনে সবচেয়ে বড় পতন। এর আগে মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) এই খাতের সূচক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তেল ও গ্যাস খাতের শেয়ার ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে, যা নয় মাসের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ লেনদেন। বিনিয়োগকারীরা ভেনেজুয়েলার তেল আমদানির বিষয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা মূল্যায়ন করছিলেন। এই খাতে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার ২ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।
তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) সূচক ২ শতাংশ কমেছে, আগের দুই সেশনে ২ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধির পর এই পতন দেখা যায়। সরকারি প্রকল্পে বড় অংশগ্রহণ থাকা ক্যাপিটাল গুডস কোম্পানি লারসেন অ্যান্ড টুব্রো ও বিহেলের শেয়ার যথাক্রমে ৩ দশমিক ১ শতাংশ ও ১০ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় সরকারি চুক্তিতে চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর পাঁচ বছর পুরোনো বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
সূত্র: পিটিআই, রয়টার্স
এসএএইচ