*নতুন তালিকায় থাকছে অত্যাবশ্যক ২৯৫টি ওষুধ*৮০ শতাংশ রোগ ও রোগীর চিকিৎসার আশাবাদ *সরকার কর্তৃক বেঁধে দেওয়া মূল্যে ওষুধ বিক্রি করতে হবে * প্রতিবছর ২৫ শতাংশ করে দাম সমন্বয় হবে
দীর্ঘ ৩০ বছর পর অত্যাবশ্যক ওষুধের নতুন তালিকা ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করছে সরকার। সর্বশেষ যখন দেশের বাজারে ওষুধের সংখ্যা মাত্র ৩৫০টি ছিল তখন ১১৭টি ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় চিহ্নিত করে তালিকা প্রণয়ন ও মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল তৎকালীন সরকার।
বিগত তিন দশকে ওষুধের সংখ্যা বেড়ে প্রায় দেড় হাজারে দাঁড়িয়েছে। বহু বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন করে অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা প্রণয়ন ও মূল্য নির্ধারণ করেনি কোনো সরকার। বিলম্ব হলেও নতুন তালিকা প্রণয়ন ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ ওষুধগুলোর ওপর মূল্য নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশে সরাসরি শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের চিকিৎসা প্রাপ্যতার ওপরে এবং ওষুধের প্রাপ্যতার ওপর প্রভাব ফেলবে। এর ফলে দেশের ৮০ শতাংশ রোগী ও তাদের বিভিন্ন রোগ ব্যাধির চিকিৎসা সহজ হবে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে জাতীয় অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ সম্পর্কিত গাইডলাইনের অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ।
নতুন তালিকায় সর্বশেষ ১১৭টিসহ সর্বমোট ২৯৫টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বিক্রেতাদের এই ওষুধগুলো সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এ সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী। দেশের মানুষের ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত ও স্বাস্থ্য খাতে সরকার ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলবে। সাধারণ মানুষ অপেক্ষাকৃত কম দামে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ কিনতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান এ সম্পর্কে বিস্তারিত গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেন।
অতীত প্রেক্ষাপটঅধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ বা স্বাস্থ্যখাতে ১৯৮২ সালের একটা ওষুধ নীতি তৈরি হয়েছিল। যেটা বাংলাদেশের ওষুধ খাতকে আসলে স্বাবলম্বী হতে এবং ওষুধকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে এবং সেটার মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মান রক্ষার্থে একটা বিরাট অবদান রেখেছে। পরবর্তীতে একযুগ পর ১৯৯৪ সালে এসে সেই বিষয়টি একটু পরিবর্তিত হয়েছিল। সব ওষুধের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে এক-তৃতীয়াংশ করা হয়।
তিনি বলেন, বাজারে তখন প্রায় ৩৫০টি ওষুধ ছিল। তার মধ্যে ১১৭টি ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এরপরেই গত প্রায় ৩০ বছর যাবৎ এই পদ্ধতি অপরিবর্তিত ছিল এবং এর ফলে এই তালিকার বা বহির্ভূত ওষুধগুলো পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকে এবং এই মুহূর্তে ওই ১১৭টির বাইরে প্রায় ১হাজার ৩০০টি ওষুধ বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক ওষুধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় মূল্য পার্থক্য পর্যায়ক্রমে বাড়ছিল।
অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে মানুষের ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশই আসলে ওষুধ খাতে ও তা ব্যক্তিগত খাত থেকে ব্যয় করে মানুষ।
তিনি জানান,অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই অত্যাবৎশক ওষুধের নতুন তালিকা প্রণয়ন ও মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করে।
অধ্যাপক সায়েদুর রহমান জানান,অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা প্রণয়নে টাসকফোর্স গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মূল্য নির্ধারণের জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলাদা কমিটি কাজ করে। টাস্কফোর্স সদস্যরা বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে (অংশীজন, উৎপাদক, বিপণনকারী,ফার্মাসিস্ট, ওষুধ বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, আইসিডিডিআরবি) বিশদ আলোচনা করেছেন বলে তিনি জানান।
অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ১৯৮২-তে অর্জিত সাফল্য এখন ট্রান্সলেটেড ইনটু রিয়াল হেলথ বেনিফিট হবে। অর্থাৎ, আমাদের স্বাস্থ্যখাত তথা ওষুধ খাতের যে অর্জন তা এখন স্বাস্থ্য সুবিধায় অনুদিত হতে থাকবে। বাধাটা পর্যায়ক্রমে কমে যাবে।
যে প্রক্রিয়ায় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ হবেপ্রচলিতভাবে মার্কআপ ঠিক রেখে (কাঁচামাল বা এপিআই এক্সিপিয়েন্টের সঙ্গে যে মার্কাপ রেট) অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকাভুক্ত ওষুধগুলোর মূল্য সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হবে এবং নির্ধারিত মূল্যের বাইরে যারা আছেন তাদের এই মূল্যে পর্যায়ক্রমে আসতে হবে। যারা ওপরে আছেন তাদেরও নেমে আসতে হবে। যারা নিচ থেকে যাবেন তারা ইচ্ছা করলে ওপরে উঠতে পারেন অথবা থাকবেন না।
ওষুধ শিল্পের ওপরে কোন প্রভাব পড়বে কি নাঅধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ইন্ডাস্ট্রির ওপরে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না এ ব্যাপারে অন্তবর্তীকালীন সরকার শুরু থেকেই খুবই সাবধান ছিল এবং খুবই সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন সিদ্ধান্ত পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের জন্য তাদের চার বছর সময় দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বছর ২৫ শতাংশ হারে তারা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত নতুন মূল্য কমাবেন। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের বাইরে যে ১১০০টি ওষুধ থাকবে সেগুলো পর্যায়ক্রমে নিয়ন্ত্রিত হবে বলে তিনি জানান।
এমইউ/এএমএ/জেআইএম