ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী ফেনীর চার উপজেলার (পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর) গ্রামগুলোতে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে ভারতীয় বিভিন্ন মোবাইলফোন কোম্পানির সিমকার্ড। ভারতীয় মোবাইলফোন নেটওয়ার্কের তরঙ্গ কম্পাঙ্কের আওতায় রয়েছে ফেনী শহরসহ চার উপজেলার বিশাল এলাকা। দেড় থেকে পাঁচ হাজার টাকায় মিলছে এসব সিমকার্ড। এসব সিমকার্ড ব্যবহারে বাড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।
সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে সরেজমিনে জানা গেছে, ছাগলনাইয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন শুভপুর ও মহামায়া, ফুলগাজী উপজেলার সীমান্তবর্তী সদর ইউনিয়ন, আমজাদহাট, আনন্দপুর, মুন্সীরহাট এবং পরশুরাম উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন বক্সমাহমুদ ও মির্জানগরের বিভিন্ন গ্রামে ভারতীয় সিমকার্ডে চলছে ইন্টারনেটভিত্তিক সব ধরনের ব্যবহার। শুধু তাই নয়, ভারতীয় সিমগুলোর ইন্টারনেট তরঙ্গ কম্পাঙ্ক ক্ষমতা এতটাই যে, ফেনী শহরে বসেও ভারতীয় মোবাইলফোন কোম্পানির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নেট দুনিয়ায় সহজ বিচরণ সম্ভব হচ্ছে।
ভারতীয় সিম বিক্রি চক্রের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ভারতীয় সিমকার্ডগুলো দেড় হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা দামে বিক্রি করছি। ইদানীং এর বিক্রি বাড়ছে। সীমান্তের বেশিরভাগ মানুষ এখন ভারতীয় সিমকার্ড ব্যবহার করছে। এগুলোর রিচার্জও আমরা বাংলাদেশে বসে করি।’
ভারতীয় মোবাইল সিমকার্ড ব্যবহারকারী বাংলাদেশি এক নাগরিক জানান, বাংলাদেশের মোবাইল কোম্পানিগুলোর নেটওয়ার্ক না থাকায় তারা বাধ্য হয়েই ভারতীয় সিমকার্ড ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশি সিম অপারেটর কোম্পানিগুলোকে বারবার অনুরোধ করেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ফেনী সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সিমকার্ড ব্যবহার করে চোরাকারবারিদের সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ের এর ব্যবহার বৃদ্ধিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ভারতীয় সিমকার্ড ব্যবহারের অবাধ সুযোগ নিয়ে অপতৎপরতার শঙ্কাও রয়েছে। ভারতীয় মোবাইল সিমের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশ সীমান্তে তরুণদের দাবি, দেশীয় মোবাইলফোন কোম্পানিগুলোর ইন্টারনেট সেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে তারা ভারতীয় সিমকার্ড ব্যবহার করেন। তারা গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ ইন্টারনেটভিত্তিক ফ্রি-ফায়ার, পাবজির মতো গেমও খেলছেন। তারা তাদের মোবাইলফোনে ব্যবহার করেন ভারতীয় কোম্পানির এয়ারটেল, জিও, ভোডাফোন, রিলায়েন্স, এয়ারসেল, টেলিনরসহ বিভিন্ন কোম্পানির সিম।
আমজাদহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইব্রাহিম মজুমদার বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি মহল ভারতীয় সিম ব্যবহার করে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি।’
ফুলগাজী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘ভারতীয় সিমকার্ডের বিষয়ে আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছি। এটি আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য নিরাপত্তা হুমকি। আমরা এসবের প্রতিকার চাই। ভারতে বসে সন্ত্রাসীরা এবারের নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করছে। এদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।’
ফেনী জেলা জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী শাখার (ইসলামিক লয়ার্স) সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট এমদাদ হোসাইন বলেন, ভিনদেশি সিম রাষ্ট্রের গোপনীয়তার জন্য হুমকি। নির্বাচন উপলক্ষে অবৈধ অস্ত্রও দেশের অভ্যন্তরে এসেছে শুনেছি। বিষয়টি খুবই উদ্বেগের।
সীমান্তের চেতনা সংঘ ক্লাবের সদস্যসচিব সাইফুল ইসলাম রাজিব। তিনি বলেন, ‘ভারতীয় সিমের অবাধ ব্যবহারের কারণে সীমান্তের ওপারে ভারতীয় চোরাকারবারিদের সঙ্গে বাংলাদেশের চোরাকারবারি ও মানবপাচারকারীরা নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। তারা মাদকপাচারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। এতে করে সীমান্ত এলাকায় অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। টাকার লোভে কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধরা অবৈধ কারবারে জড়িয়ে পড়ছেন।’
এ বিষয়ে ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) ভাষ্য, বিষয়টি তারা শুনেছেন। তবে এখনো কেউ অভিযোগ করেননি। সিমসহ কেউ গ্রেফতান হননি।
ফেনীর পুলিশ সুপার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ভারতীয় সিমের বিষয়টি আমরা এর আগেও জেনেছি। এটি জাতীয় ইস্যু। আমাদের মাধ্যমে সরকারকে বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করবো। জানতে চাইলে ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি। যদি এরকম কোনো সিমকার্ড পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আবদুল্লাহ আল-মামুন/এসআর/এএসএম