শিক্ষা

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল দাবি, অধিদপ্তর ঘেরাওয়ের ঘোষণা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আর্থিক লেনদেন ও জালিয়াত চক্রের মাধ্যমে ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষা দিয়েছেন অসংখ্য চাকরিপ্রার্থী। হাতেনাতে ধরাও পড়েছেন শতাধিক পরীক্ষার্থী। পাশাপাশি পরীক্ষা শুরুর আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।

জালিয়াতি ও অনিয়মের ব্যাপকতা বেশি থাকায় এ নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা। তারা পুনরায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি তুলেছেন। এ দাবি আদায়ে একদল চাকরিপ্রার্থী ঢাকায় অবস্থিত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ঘেরাওয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। রোববার (১১ জানুয়ারি) এ কর্মসূচি পালন করবেন বলে জানিয়েছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দেশের ৬১ জেলায় (পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা বাদে) একযোগে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরীক্ষার্থী ছিলেন ১০ লাখ ৮০ হাজারের বেশি। পরীক্ষার কয়েকদিন আগে থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ফেসবুকে শেয়ারও করেন।

পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরীক্ষার দুদিন আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নের একটি অংশ থেকে হুবহু কয়েকটি প্রশ্ন পরীক্ষায় এসেছে। এতে প্রশ্নফাঁসের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। ২৫ ডিসেম্বর প্রশ্নপত্র জেলা পর্যায়ে পাঠিয়ে দিয়ে তার প্রায় দুই সপ্তাহ পর পরীক্ষা নেওয়ায় চক্রের হাতে প্রশ্নপত্র চলে গেছে বলে অভিযোগ তাদের।

অন্যদিকে এ পরীক্ষা ঘিরে সক্রিয় হয়ে ওঠে ‘ডিভাইস পার্টি’। তারা পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে মোটা অঙ্কের অর্থ চুক্তি ডিভাইসের সহায়তা দিয়েছেন। এ চক্রটি চুক্তিবদ্ধ পরীক্ষার্থীকে ডিভাইস সরবরাহ করে এবং পরীক্ষা শুরুর পরপরই প্রশ্ন ম্যানেজ করে উত্তর বলে দেয়। পরীক্ষার্থী ডিভাইসে উত্তর শুনে পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে আসেন।

আরও পড়ুনগাইবান্ধায় পরীক্ষা চলাকালে ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ আটক ৫২দিনাজপুরে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার-প্রক্সি, আটক ১৮গাইবান্ধায় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ডিভাইসসহ পরীক্ষার্থী আটক

পরীক্ষার্থীরা জানান, উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে ডিভাইস পার্টি ব্যাপকভাবে সক্রিয় ছিল। এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর উত্তরের জেলাগুলোতে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কিছুটা তৎপর ছিল। এ কারণে ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষা দেওয়া শতাধিক চাকরিপ্রার্থীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছেন। গাইবান্ধায় ৫৩ জন, নওগাঁয় ১৮, দিনাজপুরে ১৮, কুড়িগ্রামে ১৬ ও রংপুরে দুইজনসহ শতাধিক পরীক্ষার্থী জালিয়াতি করে ধরা পড়েছেন।

তবে অসংখ্য জালিয়াত পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও কক্ষ পরিদর্শকদের নজরদারি এড়িয়ে পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে গেছেন। কোথাও কোথাও কক্ষ পরিদর্শকরাও এ চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ করে জালিয়াতিতে সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা দেখাই যায়নি। ফলে সেখানে নির্বিঘ্নে জালিয়াতি-অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ চাকরিপ্রার্থীদের।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ঘেরাওয়ের ঘোষণাপ্রশ্নফাঁস, অনিয়ম, জালিয়াতির পরও নিশ্চুপ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এতে ক্ষুব্ধ সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা। তারা এ পরীক্ষা বাতিল করে নতুন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি তুলেছেন। এ দাবি আদায়ে রোববার (১১ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। এতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা চাকরিপ্রার্থীরা অংশ নেবেন বলে জানিয়েছেন কর্মসূচির ডাক দেওয়া প্রার্থীরা।

মোনায়েম শাহ নামে এক চাকরিপ্রার্থী বলেন, আমরা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে অবস্থান নেবো। যতক্ষণ না তারা এ প্রহসনের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দেবেন, ততক্ষণ আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো। সারাদেশ থেকে আমাদের এ কর্মসূচি অংশ নিতে চাকরিপ্রার্থীরা ঢাকায় আসছেন।

জালিয়াতির ঘটনায় ‘বিচ্ছিন্ন’, পরীক্ষা সুষ্ঠু হয়েছে: দাবি অধিদপ্তরেরজালিয়াতি চক্র সক্রিয় থাকলেও পরীক্ষা সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। যারা জালিয়াতির চেষ্টা করেছেন, তারাই ধরা পড়েছেন বলেও জানিয়েছে অধিদপ্তর।

আরও পড়ুননওগাঁয় পরীক্ষার্থী-প্রশ্নফাঁস চক্রের সদস্যসহ গ্রেফতার ১৮পরীক্ষায় জালিয়াতির চেষ্টা, বিএনপি নেতাসহ আটক ১৬

জানতে চাইলে অধিদপ্তরের পলিসি অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের পরিচালক এ কে মোহম্মদ সামছুল আহসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এবার শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছে। অতীতের যে কোনো বারের পরীক্ষার চেয়ে এবার পরীক্ষা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। শিগগির এ পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে।’

জালিয়াতির দায়ে শতাধিক গ্রেফতারে নিয়োগ বিতর্কিত হবে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যারাই জালিয়াতি করার চেষ্টা করেছে, তারাই ধরা পড়েছে। প্রশাসন সক্রিয় ছিল, আমাদের কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসন, কক্ষ পরিদর্শকরা কঠোর নজরদারি করেছেন। কেউ জালিয়াতি করে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়নি। ফলে নিয়োগ পরীক্ষা বিতর্কিত হওয়ার সুযোগও নেই।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার দুই ধাপ মিলিয়ে মোট ১৪ হাজার ৩৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৮০টি। সে হিসাবে গড়ে প্রতিটি পদের বিপরীতে লড়াই করেন প্রায় ৭৫ জন চাকরিপ্রার্থী।

প্রথম ধাপে (রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগ) ১০ হাজার ২১৯টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে ৭ লাখ ৪৫ হাজার ৯২৯টি। দ্বিতীয় ধাপে (ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ) ৪ হাজার ১৬৬টি পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৫১টি। তবে ঠিক কতজন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছেন এবং কত পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত করে জানায়নি অধিদপ্তর।

এএএইচ/এমএএইচ/এএসএম