বিদ্যমান আমদানি নীতি আদেশে (২০২১-২৪) বড় পরিবর্তন এনে নতুন আমদানি নীতি আদেশের (আইপিও) খসড়া তৈরি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে বাণিজ্য সহজীকরণ ও উদারীকরণে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন আমদানি নীতিতে ঋণপত্র বা এলসি ছাড়াই বিক্রয় চুক্তির (সেলস কন্ট্রাক্ট) বিপরীতে পণ্য আমদানি অবারিত করা হতে পারে। বর্তমানে এলসি ছাড়া পাঁচ লাখ ডলার পর্যন্ত বাণিজ্যিক আমদানি করা যায়। নতুন আমদানি নীতির (২০২৫-২৮) খসড়া অনুসারে, আমদানির অনুমতি থাকা পণ্য এলসি ছাড়াই যে কোনো পরিমাণ আমদানি করা যাবে। এছাড়া নতুন নীতিতে পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়িও আমদানির সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান আমদানি নীতিতে এটি নিষিদ্ধ।
এছাড়াও খসড়া আমদানি নীতিতে পরিবেশ ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে হাইড্রোলিক হর্ন আমদানিতে বিধিনিষেধের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী হর্নের শব্দমাত্রা সর্বোচ্চ ১০০ ডেসিমেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে নতুন নীতির খসড়ায় প্রথমবারের মতো পেট্রো কেমিক্যাল শিল্পের কাঁচামাল ইথাইলিন ও প্রোপাইলিন আমদানি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের অনুমতি নেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে। আমদানি নিষিদ্ধ রাসায়নিক মিথাইল ব্রোমাইডের কারণে অস্ট্রেলিয়ায় চাল ও মসলা রপ্তানিতে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনের উদ্যোগও নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আরও পড়ুনখসড়া প্রস্তুত, আমদানি নীতি আদেশে বড় পরিবর্তন আসছে
যদিও আমদানি নীতির এসব সুবিধা নিয়ে এখনো অফিসিয়ালি কিছু জানায়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গতকাল রোববার সচিবালয়ের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নতুন আমদানি নীতি আদেশের (আইপিও) খসড়া নিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বৈঠক হয়। এরপর বাণিজ্য উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, আমদানি নীতি আদেশে পরিবর্তন আনার বিষয়ে এক মাস ধরে আলোচনা চলছে। উদারীকরণ ও সহজীকরণের লক্ষ্যেই এসব পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ সময় তিনি বলেন, খসড়া প্রস্তাব উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন পাওয়া গেলে সংবাদ সম্মেলন করে কী ধরনের সুবিধা থাকছে তা বিস্তারিত জানানো হবে। খুব শিগগির, সম্ভব হলে আগামী বৈঠকেই বিষয়টি উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে।
এ সময় বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, নতুন আমদানি নীতির পাতায় পাতায় পরিবর্তন আসছে। বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যাগ্রিমেন্টে স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন আমদানি নীতি আদেশের খসড়া তৈরির আগে বিভিন্ন চেম্বার, ব্যবসায়ী সংগঠন ও অ্যাসোসিয়েশনের মতামত নেওয়া হয়। অংশীজনের উপস্থিতিতে গতকালের বৈঠকে উপদেষ্টা ও সচিব খসড়ার মূল প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করেন। এতে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণে আর প্রায় ১০ মাস সময় বাকি থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতিটি সাজানো হচ্ছে।
আরও জানা গেছে, নতুন নীতিতে গ্যাস সিলিন্ডার আমদানিতে আলাদা এইচএস কোড নির্ধারণ, পরিবেশবান্ধবভাবে ব্যাটারি রিসাইক্লিং নিশ্চিত করে পুরোনো ব্যাটারি আমদানির সুযোগ এবং পাম অলিন আমদানিতে বিএসটিআইয়ের মান উত্তীর্ণের সনদের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়াও খসড়ায় সব ধরনের বর্জ্য পদার্থ আমদানি নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে চিংড়ি, জীবিত শূকর ও শূকরজাত পণ্য, পপি বীজ, পোস্তদানা, ঘাস, ঘন চিনি, কৃত্রিম সরষের তেল, রিকন্ডিশন্ড অফিস ইকুইপমেন্ট, পুরোনো কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী। এছাড়া ৭৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দের সব হর্ন, বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক, পলিথিন ও পলিপ্রোপাইলিন ব্যাগ এবং দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনের থ্রি-হুইলার যানবাহন আমদানিও নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।
শর্ত সাপেক্ষে আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি, তিন বছরের বেশি পুরোনো ও ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল, সাড়ে ৪ সেন্টিমিটারের কম ব্যাসের কারেন্ট জাল এবং এলএনজি। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের মতে, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানে গাড়ির বয়সসীমা শিথিল রয়েছে এবং এতে সাধারণ মানুষ কম দামে গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পায়।
এনএইচ/ইএ/এমএস