লাইফস্টাইল

শীতে নারীদের হাত-পা কেন পুরুষের তুলনায় বেশি ঠান্ডা হয়?

শীত এলেই অনেক নারী একটি অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, হাত ও পা যেন বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়। মোজা পরা, গরম পানি ব্যবহার কিংবা ভাপ নেওয়ার পরও অনেক সময় সেই ঠান্ডা ভাব কমে না। আশপাশের মানুষ যখন স্বাভাবিক অনুভব করেন, তখন নারীদের এমন ঠান্ডা লাগার পেছনে প্রশ্ন জাগে এটি কি কেবল অনুভূতির ব্যাপার, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা?

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এটি মোটেও কল্পনা বা অতিসংবেদনশীলতার বিষয় নয়। বরং নারীদের শারীরিক গঠন, হরমোনের প্রভাব, রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা ও বিপাকগত পার্থক্যের কারণেই শীতে তাদের হাত-পা তুলনামূলক বেশি ঠান্ডা হয়ে যায়।

শরীরের স্বাভাবিক সুরক্ষা ব্যবস্থা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঠান্ডা আবহাওয়ায় মানবদেহ প্রথমে জীবনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো যেমন- হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক ও ফুসফুস উষ্ণ রাখার চেষ্টা করে। এই প্রক্রিয়ায় শরীর হাত ও পায়ের মতো প্রান্তিক অংশ থেকে রক্ত সরিয়ে নেয় এবং কেন্দ্রীয় অঙ্গগুলোর দিকে পাঠায়। নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় হয়। ফলে হাত ও পায়ের ত্বকে রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে সেগুলো দ্রুত ঠান্ডা হয়ে পড়ে।

হরমোনের প্রভাব

নারীদের শরীরে থাকা ইস্ট্রোজেন হরমোন রক্তনালির কার্যকারিতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। শীতের সময় এই হরমোনের কারণে রক্তনালিগুলো দ্রুত সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভাসোকনস্ট্রিকশন বলা হয়। এর ফলে হাত ও পায়ে উষ্ণ রক্ত পৌঁছাতে দেরি হয়।

এই কারণেই নারীদের মধ্যে রেনোডস ফেনোমেনন তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এতে ঠান্ডা বা মানসিক চাপের সময় আঙুল সাদা, নীলচে কিংবা লালচে হয়ে যেতে পারে। এছাড়া মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের ওঠানামাও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে।

আরও পড়ুন:  শীতে ঠান্ডা পানি স্বাস্থ্যকর নাকি শুধু স্বস্তির অনুভূতি ওজন কমাতে খালি পেটে পান করুন গাজরের রস বয়সের প্রভাবে মস্তিষ্কের কোথায় ক্ষয় শুরু হয় বিপাকহারের পার্থক্য

পুরুষদের শরীরে সাধারণত পেশির পরিমাণ বেশি থাকে। পেশি বিশ্রাম অবস্থাতেও তাপ উৎপন্ন করে, যার ফলে তাদের বেসাল মেটাবলিক রেট তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে নারীদের শরীরে চর্বির পরিমাণ বেশি হলেও এই চর্বি মূলত শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে। হাতপায়ের মতো প্রান্তিক অংশে এর তেমন প্রভাব পড়ে না। ফলে শীতে নারীদের হাত ও পা দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়।

রক্তসঞ্চালন ও অন্যান্য শারীরিক কারণ

নারীদের গড় রক্তচাপ সাধারণত পুরুষদের তুলনায় কিছুটা কম হয়। পাশাপাশি প্রান্তিক রক্তপ্রবাহের গতি ধীর হওয়ায় হাত ও পায়ে উষ্ণ রক্ত পৌঁছাতে সময় লাগে। এছাড়া নারীদের মধ্যে রক্তাল্পতা বা আয়রনের ঘাটতি বেশি দেখা যায়, যা শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দেয় এবং ঠান্ডা লাগার অনুভূতি বাড়িয়ে তোলে। থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস, অটোইমিউন রোগ কিংবা কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও এই সমস্যার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

কখন সতর্ক হওয়া জরুরি

সব ক্ষেত্রে হাত-পা ঠান্ডা হওয়াকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। যদি এর সঙ্গে ব্যথা, অবশভাব, ত্বকের রং পরিবর্তন বা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলতে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এসব লক্ষণ হাইপোথাইরয়ডিজম, রেনোডস ফেনোমেনন, পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ কিংবা অটোইমিউন রোগের ইঙ্গিত হতে পারে।

শীতকালে নারীদের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া মূলত শরীরের একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। হরমোন, বিপাকহার ও রক্তসঞ্চালন একসঙ্গে কাজ করে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে উষ্ণ রাখে আর তার প্রভাব পড়ে হাত ও পায়ের ওপর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক হলেও উপসর্গ গুরুতর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

তথ্যসূত্র: মায়ো ক্লিনিক

জেএস/