সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৪ হাজার ৩৮৫ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগে ‘তাড়াহুড়ো’ করার অভিযোগ তুলেছেন নিয়োগপ্রত্যাশীরা। স্বল্প সময়ে আবেদন নিয়ে পরীক্ষা গ্রহণ করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এবার দ্রুত ফল প্রকাশ করে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই চূড়ান্তভাবে এ নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের। এমন তাড়াহুড়োকে সন্দেহ-সংশয়ের চোখে দেখছেন সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীরা।
তবে অধিদপ্তর বলছে, শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া তাদের নিয়মিত কাজ। তফসিল ঘোষণা, নির্বাচন বা অন্য কোনো কিছুর কারণে নিয়োগ আটকে রাখার সুযোগ নেই। শিক্ষক সংকট কাটিয়ে উঠতে তারা স্বাভাবিক নিয়মে কাজ করছে। এক্ষেত্রে তাহাহুড়োর অভিযোগ সত্য নয়।
জানা যায়, গত ৫ নভেম্বর প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে প্রথম ধাপ এবং ১২ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। প্রথম ধাপে ৮ থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদন নেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে ১৪ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদন প্রক্রিয়া চলে। এরপর ২ জানুয়ারি লিখিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে ৯ জানুয়ারি করা হয়।
এদিকে, গত ৯ জানুয়ারি পরীক্ষা নেওয়ার পর প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ কমিটির সদস্যরা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে বৈঠক করে। সেখানে ২০ জানুয়ারির মধ্যে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে মৌখিক পরীক্ষা শুরুর পরিকল্পনা করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—আগামী ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত নিয়োগের ফল প্রকাশ করা হবে। অর্থাৎ, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হবে।
চাকরিপ্রত্যাশীরা বলছেন, এর আগে প্রাথমিকে কখনো এত দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করা হয়নি। এবার নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তড়িঘড়ি করছেন। এ কারণে তাদের মধ্যে সন্দেহ বাড়ছে। প্রশ্নফাঁস, জালিয়াতি ও অনিয়ম হয়েছে অভিযোগ করে এ পরীক্ষা বাতিল করার দাবিতে আন্দোলনও করছেন।
পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করা চাকরিপ্রত্যাশী আনোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রশ্নফাঁস যে হয়েছে, তা দিবালোকের মতো সত্য। পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র একটি চক্রের হাতে চলে গেছে। সেই প্রশ্ন সোশ্যাল মিডিয়াতেও অনেকে পেয়েছেন। পরে দেখা গেছে প্রশ্নের সঙ্গে মিল রয়েছে।’
আরও পড়ুনপ্রাথমিকে ১৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ ঘিরে সক্রিয় প্রশ্নফাঁস চক্রপ্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্নফাঁস নিয়ে যা বলছে অধিদপ্তরপ্রাথমিকে কর্মঘণ্টা বাড়লো, শিক্ষকদের ক্ষোভ
প্রশ্নফাঁস না হলে ডিভাইস ব্যবহার করে ফায়দা কী এমন প্রশ্নও করেন তিনি। আনোয়ার বলেন, ‘আমি তিনবার প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা দিয়েছি। এখানে পরীক্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ প্রশ্ন সমাধান করে ডিভাইসের মাধ্যমে উত্তর সরবরাহ করে একটি চক্র। এ চক্রের সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’
বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় এমসিকিউ (বহুনির্বাচনি) প্রশ্ন থাকে। ২০০ নম্বরের এ পরীক্ষায় ২০০টি প্রশ্নের উত্তর করতে হয়। সময় থাকে দুই ঘণ্টা বা ১২০ মিনিট। অথচ প্রাথমিকের ৯০টি প্রশ্নের ৯০ নম্বরের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় সময় দেওয়া হয়েছে ৯০ মিনিট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত এ সময়ের সুযোগ নিচ্ছে জালিয়াতি চক্র। পরীক্ষার কক্ষে প্রশ্নপত্র বিলি করার পর দ্রুত তা বাইরে বের করে দেন কক্ষ পরিদর্শক বা শিক্ষা কর্মকর্তারা। এরপর তা দ্রুত সমাধান করে পরীক্ষার্থীদের কাছে উত্তর ডিভাইসের মাধ্যমে সরবরাহ করে জালিয়াত চক্রের সদস্যরা।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘৯০ মিনিট সময় দেওয়া নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। এ নিয়ে অধিদপ্তরেও আলোচনা হয়েছে। বিসিএসের সঙ্গে মিলিয়ে প্রাথমিকের পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয় বলে ৯০ মিনিট সময় রাখা হয়েছে। এ নিয়ে ব্যাপক আপত্তি থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তাতে পরিবর্তন আনা হয়নি।’
তাড়াহুড়ো নয়, নিয়মিত কাজ করছি: ডিজিসহকারী শিক্ষক নিয়োগে তাড়াহুড়ো নয়, বরং নিয়মিত কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট ব্যাপক। ১৪ হাজার ৩৮৫টি শূন্যপদে বিজ্ঞপ্তি হয়েছে। সেগুলোর নিয়োগ চলছে। আরও যে ৩২ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের পদোন্নতি দিলে পদগুলো খালি হয়ে যাবে। তখন আরও ৩২ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষক সংকট কাটাতে নিয়োগপ্রক্রিয়া গতিশীল করা হয়েছে।’
সামনে নির্বাচন, তার আগে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনের সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তফসিলের পর এ ধরনের নিয়োগে যে কোনো বাধা আছে, তাও নয়। এটা (নিয়োগ) আমাদের নিয়মিত কাজ। নির্বাচন বা অন্য কোনো কারণে এটা আটকে রাখার কথা নয়।’
এএএইচ/ইএ