শান্ত নদীর বুকে সারি সারি খাঁচার মধ্যেই চলছে মাছ চাষ। এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে বিক্রি করছেন লাখ লাখ টাকা। অন্যরা যেখানে নদীর পানিতে এমন কিছু করার কথা কল্পনাও করেননি; সেখানে প্রবাসফেরত যুবক এনামুল হক লাখ লাখ টাকার মাছ চাষ করে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এটা সম্ভব হয়েছে আত্রাই নদীতে রাবার ড্যামের উজানে আটকে থাকা গভীর পানির কারণে।
দিনাজপুর সদর উপজেলার মোহনপুর আত্রাই নদীর ওপর মোহনপুর সেতু। সেতুর উত্তর পাশে উজানে বিশাল রাবার ড্যাম। সেই ড্যামের উত্তর পাশ ঘেঁষেই এ মাছ চাষ প্রকল্প। প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হয় প্রায় ১৮ লাখ টাকা। এনামুল শুরু করেছিলেন মাত্র ১০টি খাঁচা দিয়ে। আজ সেই খাঁচা বেড়ে হয়েছে ৬৭টি। এই খাঁচায় মাছ চাষ করে কয়েক দফায় বিক্রি করে তুলেছেন ২০ লাখ টাকা। অবশিষ্ট মাছ বিক্রি করে আরও ১০-১২ লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন মাছ চাষি এনামুল।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বছরে প্রায় ৯৩ হাজার মেট্রিক টন মাছের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হয় ৭৩ হাজার টন। ২০ হাজার টন মাছ ঘাটতি আছে। এর মূল কারণ পুকুর বা ডোবায় পানির ঘাটতি। তাই নদীর পানিকে ব্যবহার করে খাঁচায় মাছ চাষ করলে এ ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব।
জানা গেছে, এটিই জেলায় একমাত্র মাছ চাষ প্রকল্প। প্রায় ৭ বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রবাস জীবন কাটানোর পর দেশে ফেরেন এনামুল। এসে ঠিক করেন কিছু করবেন। চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন রাবার ড্যামের কারণে আত্রাই নদীতে পানির গভীরতা অনেক। সেই গভীরতাকেই মূলধন বানিয়ে শুরু করেন ভাসমান খাঁচায় মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ। এখানে দিন দিন বাড়ছে কর্মংস্থানের সুযোগ। নদীর পানিতে ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষের এ পদ্ধতি দেখে অবাক দিনাজপুরবাসী। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেড়াতে আসেন এখানে। কেউ শিখতে আসেন, কেউ আবার অনুপ্রেরণা নিতে। রাবার ড্যাম দেখতে এসে মানুষ ছুটে যান ভাসমান খাঁচায় মাছ দেখতে।
আরও পড়ুনমাগুরায় মধু চাষে বাবা-ছেলের বাজিমাত শখ থেকে পাখির ব্যবসা, মাসে বিক্রি ৩ লাখ
উদ্যোক্তা এনামুল হক মনে করেন, দেশের বেকার যুবকেরা চাকরির পেছনে না ছুটে এমন উদ্যোগ নিলে পরিবারে স্বচ্ছলতা আসবে। দেশও এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘এভাবে মাছ চাষ করতে চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদীতে অনেক দেখেছি। দেখে-শুনে ভেবে-চিন্তে নিজ এলাকায় এ মাছ চাষ শুরু করি। রাবার ড্যামের কারণে পানির গভীরতা বেশি এবং পানি চলাচল করে। সে কারণে জায়গাটি বেছে নিয়েছি। এখানে সব সময় ১৭-১৮ ফুট পানি থাকে। জেলা মৎস্য অফিসারের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে মাছ চাষ শুরু করি। মৎস্য অধিদপ্তর আর্থিক সহযোগিতা করতে না পারলেও অন্যান্য সমর্থন পেয়েছি।’
রামার ড্যামে বেড়াতে আসা রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ এর আগে কোনো দিন দেখিনি। প্রথমবার দেখেছি। দেখে অনেক ভালো লাগছে।’
মাছের পরিচর্যা করেন মকবুল হোসেন ও গোলাম মোস্তফা। তাদের সংসার চলে খামারে মাছের পরিচর্যা করে। তারা বলেন, ‘যে খাঁচাগুলো করা হয়েছে; এগুলো ৩-৪ বছর টিকবে। এ খাঁচায় মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ করা হয়। তাছাড়া যেদিন মাছ তোলা হয়; সেদিন বেশ কয়েকজনের কর্মসংস্থান হয়।’
উদ্যোক্তা এনামুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘যাদের একটু টাকা-পয়সা আছে; তারা চাকরির পেছনে না ছুটে আমার মতো মাছ চাষ করতে পারেন। পাশে পুরো নদী ফাঁকা আছে। একটা পিয়নের চাকরি নিতে গেলে ১০-১২ লাখ টাকা দিতে হয়। সেখানে টাকা না দিয়ে মাছ চাষ করলে নিজের ও দেশের জন্য ভালো।’
দিনাজপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা তারিকুর রহমান সরকার বলেন, ‘এনামুল হককে বিভিন্ন প্রকার পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছে জেলা মৎস্য দপ্তর। কারিগরি এবং টেকনিক্যাল সহযোগিতা এবং বিভিন্ন সাপোর্টের মাধ্যমে তাকে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছি। তিনি তার অর্থ দিয়ে এ প্রকল্প তৈরি করেছেন।’
এএমএইচএম/এসইউ