ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। প্রকৃতির রং ধূসর। নদীর ঘাটে কয়েকটি মাছের ট্রলার। সেসব ট্রলারের কাঠ ভেজা। মোটা দড়ি, ভেজা জাল আর কজন মানুষের ঘামে মিশে থাকা কাঁচা চিংড়ির কাঁচা গন্ধ ভাসছিল। নৌকার ভেতরে উঁকি দিতেই দেখা যায়, বরফের ঘুমে শুয়ে আছে কত কত লাল চিংড়ি। নৌকার কোমর-সমান গভীর খোপে রাখা চিংড়িগুলো বিদেশযাত্রার অপেক্ষায়। যে চিংড়ি মাত্র দুই-এক দিন আগেও বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে লাফাচ্ছিল, তা কয়েক দিনের মধ্যেই টোকিও বা আমস্টারডামের কোনো রেস্টুরেন্টে পরিবেশিত হবে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় জলরাশি লাল চিংড়ির জন্য আদর্শ। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ ও লবণাক্ত পানিতে এই প্রজাতির চিংড়ি প্রচুর জন্মে। বর্তমানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য এটি। বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের জেলেদের ধরা এসব চিংড়ি বিদেশিদের খাবারের থালায় স্থান পায় অনেকটা কর্মযজ্ঞ শেষে। চিংড়ি ধরে নৌকাতেই বরফে সংরক্ষণ, মাথা আলাদা করা ও বাছাইয়ের পরই ওদের যাত্রা হয় আন্তর্জাতিক বাজারে।
বরফের ঘুমে বিদেশে পাড়ি জমানো এই লাল সোনা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আনে, কিন্তু তার পেছনে লুকিয়ে থাকে ঘাম, নোনা পানি আর নীরব লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস।
সমুদ্রে ধরা ও প্রক্রিয়াজাতকরণবাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে ট্রলার ও নৌকায় কাজ করেন হাজার হাজার জেলে। দিনের পর দিন তারা ঢেউ আর ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে জাল ফেলেন। সেই জালে ধরা পড়ে রেড শ্রিম্প বা লাল চিংড়ি। জেলেরা সাধারণত গভীর সমুদ্রে গিয়ে ট্রল জাল ফেলেন। কয়েক ঘণ্টার পরিশ্রমের পর যখন জাল তোলা হয়, তখন রুপালি মাছের ভিড়ে উজ্জ্বল লাল চিংড়িগুলো আলাদা করে চোখে পড়ে।
নীল প্লাস্টিকের ক্রেটে বরফের নিচে শুয়ে আছে লাল চিংড়ি। এখান থেকেই শুরু হবে ট্রাক, হিমাগার ও জাহাজের দীর্ঘ যাত্রা। ছবি: খায়রুল বাশার আশিক
এই পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি শুরু হয় মাথা আলাদা করা। রপ্তানির জন্য কেবল বডি বা দেহাংশ রাখা হয়। অনেক সময় এই কাজটা নৌকাতেই করা হয়, কখনো ঘাটে এনে। বেশিরভাগই চিংড়িগুলো নৌকা থেকে তোলা হয়, খোলা মাঠে ঢালা হয়। ঘাটে নামার পরই শুরু হয় বাছাই। আকার, রং ও সতেজতার ভিত্তিতে চিংড়ি আলাদা করা হয়। সেখানে শত শত শ্রমিক ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেন। চিংড়ির মাথা ছাঁটা, খোসা ছাড়ানো, ধোয়ার কাজ করেন শ্রমিকরা। মাথা আলাদা করা হলে আবার ঢেকে দেওয়া হয় বরফে। ঠান্ডা যেন সময়কে থামিয়ে রাখে।
কেন মাথা আলাদা করা হয়? চিংড়ি ধরার পর প্রথম ৪-৬ ঘণ্টার মধ্যে বরফে না রাখলে পচন শুরু হয়। তাই জেলেরা সমুদ্রেই চিংড়িকে বড় প্লাস্টিকের ক্রেট ও বস্তায় বরফ দিয়ে রাখেন। যত দ্রুত সম্ভব মাথা আলাদা করা হয়। কারণ, চিংড়ির মাথায় এনজাইম দ্রুত পচন ঘটায়। মাথা থাকলে রপ্তানিতে ওজন বেশি হলেও মান কমে। আন্তর্জাতিক বাজারে ‘হেডলেস স্রিম্প’এর চাহিদা বেশি। ফলে ধরা চিংড়ির প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ ওজন (মাথা ও খোলস) স্থানীয় পর্যায়েই বাদ পড়ে যায়। এককথায় বলতে চাইলে, রপ্তানির মান বজায় রাখতে চিংড়ির মাথা আলাদা করা হয়।
শুরু হয় পণ্যের যাত্রাবরফের সঙ্গে মাথাহীন চিংড়িগুলো ককসিটের বায়ুরোধী বক্সে বন্দি হয়। চলে যায় বড়সব আরতদার বা পাইকারদের ঠিকানায়। পাইকাররা ঠান্ডা ঘরে বা ফ্রিজিং ট্রাকে পাঠান প্রসেসিং কারখানার দিকে। খুলনা, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে রয়েছে এসব কারখানা। কারখানায় গিয়ে এগুলো ধোয়া ও গ্রেডিং হয়। এই পাইকারদের থেকে কিনে নেন ঢাকা-চট্টগ্রামের রপ্তানিকারকরা। প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর চিংড়ি ঢোকানো হয় শীতল কনটেইনারে। এরপর সমুদ্র বা আকাশপথে পাড়ি জমায় বিদেশে।
রপ্তানি বাজার ও অর্থনৈতিক গুরুত্ববঙ্গোপসাগরের একটি নৌকা থেকে শুরু হয়ে এই চিংড়ি পৌঁছে যায় ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়ার সুপারমার্কেট ও রেস্টুরেন্টে। বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে ৫০০-৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের চিংড়ি ও হিমায়িত মাছ রপ্তানি করে। এর মধ্যে লাল চিংড়ি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাত। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭-৮ লাখ মেট্রিক টন সামুদ্রিক মাছ ও চিংড়ি ধরা পড়ে, যার একটি বড় অংশ আসে গভীর সমুদ্র থেকে। এর মধ্যে লাল চিংড়ির অংশ তুলনামূলকভাবে কম হলেও বাজারমূল্য বেশি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ আরো বেশকিছু দেশে বাংলাদেশি লাল চিংড়ির কেজি দাম বাংলাদেশি টাকার হিসাবে ২,৫০০ থেকে ৬,০০০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করে।
একজন শ্রমিক নৌকার নিচের খোপে বরফ ঢালছে। এই অন্ধকার জায়গাটাই নৌকার অস্থায়ী কোল্ড স্টোরেজ। ছবি: খায়রুল বাশার আশিক
একটি নীরব বৈশ্বিক যাত্রালাল চিংড়ি বাংলাদেশের উপকূলীয় অর্থনীতির এক নীরব চালিকাশক্তি। এই শিল্পের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে উপকূলের শ্রমিকদের ওপর। প্রায় ৬-৭ লাখ জেলে সরাসরি সমুদ্রে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত। আরো ১৫-২০ লাখ মানুষ চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বরফ কারখানা ও রপ্তানিতে কাজ করেন। এককথায় বলতে গেলে- জেলে, আড়তদার, শ্রমিক, পরিবহণকর্মী সবাই মিলে তৈরি করেন এক বিশাল অথচ নীরব যাত্রাপথ।
এই যাত্রার প্রথম এবং সবচেয়ে কঠিন ধাপটি পেরোতে হয় বাংলাদেশের জেলেদের হাত ধরেই বরফ, দড়ি আর সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে। জাল-জলে কাজ করা ওই মানুষগুলো বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রথম কড়ি। কিন্তু এই চিংড়ির দামের বড় অংশ যায় না সেই মানুষগুলোর হাতে, যারা নৌকার ভেতরে অন্ধকার খোপে নেমে বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে কাজ করেন। জেলেরা সমুদ্রে কেজি প্রতি পান গড়ে ৩০০-৪০০ টাকা।
ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা, অনিশ্চিত আয় আর কঠিন শ্রমের মধ্যেই জেলেরা চিংড়ি ধারেন। চট্টগ্রামের জেলে আবু সালেহ মিয়া বলেন, ‘লাল চিংড়ি আমাদের কাছে সোনার মতো। একটা ভালো দিন মানে কয়েক হাজার টাকা আয়। কিন্তু এই ‘সোনা’ ঘরে তোলার পথ মোটেও সহজ নয়। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, ঝড়, আর অনিশ্চয়তা জেলেদের নিত্যসঙ্গী।’
যদিও এখনো কিছু সংকট-শঙ্কায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এই বাণিজ্যিক সম্পদটি। এ বিষয়ে সার্ক কৃষি কেন্দ্রের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার মো. আবুল বাশার বলেন, বাংলাদেশের লাল চিংড়ি এখন শুধু সমুদ্রের গহ্বরেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক বাজারে তার স্বাদ ও গুণ-মানের পরিচয় ধরে রেখেছে। তথাপি পরিবহন সংকট, ব্যাংকিং ও মান নিয়ন্ত্রণের মতো চ্যালেঞ্জের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে উৎপাদন বৃদ্ধি, মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।
রেড স্রিম্প শুধুই সামুদ্রিক খাবারের গল্প নয়, এগুলো শ্রম, বৈশ্বিক বাণিজ্য আর বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের জীবনের গল্প। এই পুরো সরবরাহ-শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবন। ঝড়, ট্রলার দুর্ঘটনা এবং গভীর সমুদ্রের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিটি ভোরে জেলেরা নৌকায় ওঠেন। কারণ লাল চিংড়িই জেলেদের সংসারে ভাত হয়ে ফিরে আসে, সরাসরি না, ঘুরে অনেক হাত পেরিয়ে। আরও পড়ুনএসওএস ভিলেজে কেটেছে শৈশব, তাদের অনেকে আজ সমাজ গড়ার কারিগরকুমড়া বড়িতে সচ্ছলতা ফিরছে গ্রামীণ পরিবারে
কেএসকে/এমএস