প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, ফ্যাসিবাদের নিষ্পেষণে জর্জরিত রাষ্ট্রকে উদ্ধার করতে প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। আর সেই সংস্কারের লক্ষ্যেই আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলা সময়ের দাবি।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) ময়মনসিংহে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সার্কিট হাউস ময়দানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এ অনুষ্ঠান হয়। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য জানিয়েছেন।
আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধানের ৭ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু এতদিন সেই জনগণকেই বঞ্চিত রাখা হয়েছে। বিবেকের তাড়নায় গণভোটে অংশগ্রহণ জরুরি, যেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ অতীতের মতো না হয়। মনে রাখবেন, গণভোটের জয়ের মাধ্যমে আপনার কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র তৈরির পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও আমরা তা অর্জন করতে পারিনি। সময় এসেছে গণভোটে রায়ের মাধ্যমে জনগণের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণের। স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচিত সরকারই ৪২ শতাংশের অধিক ভোট পায়নি। সংস্কার প্রস্তাব অনুসারে, সংবিধানের উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতে ১০০টি আসন থাকবে। অর্থাৎ যে দল মোট ভোটের মাত্র ৫ শতাংশ পেয়েছে কিন্তু সরকার গঠন করতে পারেনি, তারও পাঁচজন প্রতিনিধিত্ব থাকবে সংসদের উচ্চকক্ষে। আর সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে (কমপক্ষে ৫১ ভোটের সমর্থন)।’
রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ও দায়িত্ব সম্পর্কে আলী রীয়াজ বলেন, বিগত সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই সব হতো। সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতি কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ব্যতীত অন্য কোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। অথচ বলা হয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়, বিচারব্যবস্থায় বিচারপতি নিয়োগ- এসব রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পদায়ন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এগুলো তৎকালীন সরকারপ্রধানের ইচ্ছা অনুসারেই হয়ে থাকে।
সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি নিজ দলের এমপিদের মুখে স্কচটেপ এটে দেওয়ার মতো। এ ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকাশে বিশাল বাধা। এ থেকে উত্তরণে সংস্কার প্রস্তাবে অর্থবিল এবং আস্থা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে এমপিরা নিজ নিজ দলের অনুগত থাকবে, অন্য বিষয়ে তারা স্বাধীন মতামত প্রদান করতে পারবেন, এমন প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীরা গণভোটের প্রচারণা করতে পারেন কি না- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীরা গণভোটের প্রচারণা করতে পারেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী আইনগত কোনো বাধা নেই।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল উদ্দেশ্য- সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের মতো বিষয় যেন সম্মানের সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারি তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা এমন একটা সমাজ চাই যে সমাজে আমার সন্তানের পরিচয় নির্ধারণ হবে তার যোগ্যতার ওপর, তার অর্জিত জ্ঞান ও প্রচেষ্টার ওপর। গণভোটে হ্যাঁ দিলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ থাকবে না, আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস থাকবে না বলে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যা বোগাস।’ তিনি অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।
আরেক বিশেষ অতিথি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব মর্যাদার সঙ্গে হবে না কি স্বৈরাচারী হবে, জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে হবে না কি বিপক্ষে হবে তার জন্যই গণভোট। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার সুরক্ষার জন্য এ গণভোট জরুরি।
মনির হায়দার বলেন, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও সুযোগ আমাদের সামনে। আমরা আর নিজ দেশে পরবাসী হয়ে থাকতে চাই না, নিজ অধিকার সুরক্ষার জন্যই এই গণভোট।’
ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার ফারাহ শাম্মীর সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফজলুর রহমান, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি আতাউল কিবরিয়া প্রমুখ।
এমইউ/একিউএফ