আন্তর্জাতিক

ক্ষমতায় বসেই বদলে গেছেন মামদানি?

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে তুলনামূলকভাবে সংযত ও হিসাবি অবস্থান নিয়েছেন জোহরান মামদানি। অভিষেক ভাষণে ‘র‍্যাডিক্যাল’ আখ্যা পাওয়ার ভয়ে নিজের নীতির সঙ্গে আপস করবেন না—এমন দৃঢ় বার্তা দিলেও ক্ষমতায় বসার পর বাস্তব শাসনকাজে তিনি অনেক ক্ষেত্রেই সতর্ক কৌশল বেছে নিচ্ছেন।

নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুলের ‘স্টেট অব দ্য স্টেট’ ভাষণে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার (প্রি-কিন্ডারগার্টেন) সম্প্রসারণে অর্থায়নের ঘোষণা এলে মামদানি দাঁড়িয়ে করতালি দেন, যদিও পরিকল্পনাটি তার নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তবে কর না বাড়িয়ে ‘রূপান্তরমূলক বিনিয়োগ’-এর প্রস্তাব এলে তিনি বসেই থাকেন, অথচ ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর দাবিতে মামদানি ও তার সমর্থকরা দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার।

ওভাল অফিসে বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মামদানির টেক্সট ও ফোনালাপ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি গভর্নর হোকুলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন। রাজ্য নেতৃত্বের সহযোগিতায় তার উচ্চাভিলাষী এজেন্ডার কিছু প্রাথমিক অগ্রগতিও হচ্ছে।

আরও পড়ুন>>হুমকি-ধামকি, মিডিয়ার চাপ/ মামদানিকে ঠেকাতে ট্রাম্পের সব চেষ্টাই ব্যর্থট্রাম্প-মামদানির সম্পর্ক তাহলে কি বদলে গেলো?ট্রাম্পের দাপটের সামনে ডেমোক্র্যাটরা কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

তবে বাজেট বাস্তবতা মামদানিকে আপসের পথে ঠেলে দিতে পারে। সিটি কম্পট্রোলারের এক প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার ঘাটতি এবং আগামী বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য ঘাটতির সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

মেয়র হিসেবে এখন পর্যন্ত মামদানির কার্যক্রম অনেকটাই প্রচলিত প্রশাসনিক কাজে সীমাবদ্ধ—প্রতিদিন একাধিক কর্মসূচি, নীতিগত ঘোষণা, সেতুর র‍্যাম্প সংস্কার, জনশৌচাগার স্থাপন, আবাসন নির্মাণ ও ব্যবসায়িক লাইসেন্সে জটিলতা কমানোর উদ্যোগ। তিনি ও তার স্ত্রী রামা দুয়াজি কুইন্সের ভাড়ানিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে সম্প্রতি আপার ইস্ট সাইডের গ্রেসি ম্যানশনে উঠেছেন।

গভর্নরের সঙ্গে নতুন সমীকরণ

মামদানি ও হোকুল দুজনই মেয়র–গভর্নরের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন পেছনে ফেলতে আগ্রহী। হোকুলের শিশু যত্ন ও ব্যয়সংকোচনের ওপর জোর মামদানির নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার পরিকল্পনা নিউইয়র্কজুড়ে বিনা বা স্বল্পমূল্যের শিশু যত্ন বাড়াবে, যা মামদানির সর্বজনীন শিশু যত্ন প্রস্তাবের একটি ভিত্তি হতে পারে।

তবে মামদানি ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর অবস্থান থেকে সরে আসছেন না। তিনি বলেন, ‘নিউইয়র্ক সিটির জন্য অতিরিক্ত স্থায়ী রাজস্ব প্রয়োজন। ১০ লাখের বেশি ভোটার ধনীদের ও বড় করপোরেশনের ওপর কর বাড়ানোর পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন।’

ইসরায়েল ও ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে চাপ

মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মামদানি সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের জারি করা দুটি নির্বাহী আদেশ বাতিল করেন, যেগুলো ইহুদিবিদ্বেষের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং ইসরায়েলবিরোধী বিনিয়োগ প্রত্যাহার কর্মসূচিতে শহরের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছিল। এতে ইসরায়েল সরকার ও নিউইয়র্কের কিছু ইহুদি নেতার সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।

আরও পড়ুন>>কোরআন ছুঁয়ে নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে শপথ নিলেন মামদানিযেভাবে ভোটারদের মন জয় করলেন জোহরান মামদানিমামদানির জয়ের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জারা রহিম

কুইন্সে একটি সিনাগগের বাইরে বিক্ষোভে হামাস সমর্থন ও উসকানিমূলক স্লোগানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর মামদানির প্রতিক্রিয়া দিতে দেরি হওয়ায়ও সমালোচনা হয়। পরে তিনি ভাষাটিকে ‘ভুল’ বলে নিন্দা জানান এবং উপাসনালয়ে যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করেন। পরবর্তীতে তিনি হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

পুলিশ ইস্যুতে সংযম

এর আগে আইনসভা সদস্য হিসেবে পুলিশের কড়া সমালোচক ছিলেন মামদানি। মেয়র নির্বাচনী প্রচারে তিনি সেই মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশকে বহাল রাখেন, যা মধ্যপন্থিদের প্রশংসা পায়।

জানুয়ারির শুরুতে পুলিশ জড়িত এমন দুটি প্রাণঘাতী ঘটনার পর মামদানি মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সংযম দেখান। তিনি বলেন, চলমান তদন্তে ‘আগাম সিদ্ধান্ত’ টানবেন না এবং জননিরাপত্তায় পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেন। এতে পুলিশ বেনেভোলেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্যাট্রিক হেনড্রির প্রশংসাও পান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মামদানির প্রথম সপ্তাহগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুত ‘কোর্স কারেকশন’। সিটি হলে বসার পর তিনি প্রচারণার সময়ের তুলনায় কম তাৎক্ষণিক ও বেশি হিসাবি অবস্থান দেখাচ্ছেন। তার এমন আচরণ ক্ষমতায় থাকার সময় স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: সিএনএনকেএএ/