অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিশ্বে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। আমরা চাই না ভবিষ্যতে কোথাও এমন জাদুঘর তৈরি করার প্রয়োজন পড়ুক। তবে যদি কখনো জাতি কোনো কারণে দিশেহারা হয়, তবে এ জাদুঘরে পথ খুঁজে পাবে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) গণভবনে চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনকালে এ কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। বিকেল ৩টার দিকে জাদুঘরে পৌঁছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ও শেখ হাসিনার ১৬ বছরের দুঃশাসনের চিত্রগুলো ঘুরে দেখেন তিনি।
এ সময় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এসময় উপদেষ্টাদের মধ্যে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার এসডিজি সমন্বয়ক লামিয়া মোর্শেদ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া গুমের শিকার পরিবারেরগুলোর সংগঠন মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা তুলি ও গুম থেকে ফেরত ভিকটিম ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান, জুলাই অভ্যুত্থানে সম্মুখসারিতে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও হাসনাত আবদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নেতৃত্বে জাদুঘরের কিউরেটর তানজীম ওয়াহাব, মেরিনা তাবাসসুম খান, জুলাই জাদুঘরের গবেষকসহ দায়িত্বশীল অন্যান্যরা আগতদের পুরো জাদুঘর ঘুরিয়ে দেখান।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে অভ্যুত্থানের ছবি, বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন, শহীদদের পোশাক, চিঠিপত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সে সময়কার পত্রিকার কাটিং, অডিও-ভিডিওসহ নানা উপকরণ সংরক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে।
জাদুঘর পরিদর্শনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্মিত ১৫ মিনিটের একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। যেখানে ফ্যাসিস্ট শাসনামলে গুম, রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত দমন-পীড়ন, বিরোধীদের ওপর হামলা এবং চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার চিত্র তুলে ধরা হয়।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিত হবে এখানে এসে একটি দিন কাটানো, শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে এ জাদুঘরে আসবেন। এ জাদুঘরে একটা দিন কাটালে মানুষ জানতে পারবে কী নৃশংসতার মধ্যদিয়ে এ জাতিকে যেতে হয়েছে। এখানে যে আয়নাঘরগুলো তৈরি হয়েছে সেখানে কিছু সময়, কয়েক ঘণ্টা অথবা একটা দিন কেউ যদি থাকতে চায় সে যেন থাকতে পারে।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আয়নাঘরে বসে পরিদর্শনকারীরা উপলব্ধি করতে পারে কী নৃশংসতার মধ্যে বন্দিরা ছিল! এ ধরনের নৃশংস ঘটনা না হওয়ার পক্ষে কীভাবে আমরা সবাই এক থাকতে পারি সেটা মনের মধ্যে আনতে হবে। এই একটা বিষয়ে আমরা সবাই এক থাকবো যে এ ধরনের নৃশংস দিনগুলোতে এ জাতি আর ফিরে যাবে না।
তিনি বলেন, নৃশংস একটা কাণ্ড হচ্ছিল। তরুণরা, ছাত্ররা এটার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, প্রতিহত করেছে। তাদের কোনো অস্ত্রশস্ত্র ছিল না, কিছু ছিল না। সাধারণ মানুষও যে এমন নির্ভয়ে, সাহসিকতার সঙ্গে অস্ত্রের মুখে দাঁড়াতে পারে- এটাই আমাদের শিক্ষা।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীসহ জাদুঘরের কাজে নিয়োজিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ‘অল্প সময়ে এ জাদুঘরের কাজ এ পর্যায়ে এসেছে এটা একটা রেকর্ড। এটা সম্ভব হয়েছে অনেক ছেলেমেয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে। আট মাস ধরে বিনাপারিশ্রমিকে এখানে কাজ করেছেন অনেকে। তাদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের আরও কিছু সেকশনের কাজ আগামী কয়েকদিনের মধ্যে শেষ হবে এবং নির্বাচনের আগে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে। জুলাই জাদুঘর ইতিহাসের চিহ্ন বহন করে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে এটি রাজনৈতিক আলোচনা, শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প ও সাহিত্যচর্চায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’
এমইউ/এমএএইচ/