ধর্ম

মানবসভ্যতার আদর্শ মহানবী (সা.)

আহমাদ সাব্বির

মানবসভ্যতার ইতিহাসে মানুষ বারবার এমন এক আদর্শের সন্ধান করেছে, যে আদর্শ শুধু বিশ্বাসের নয়, বরং জীবনযাপনের প্রতিটি স্তরে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পথনির্দেশনা দিতে সক্ষম। শক্তি, জ্ঞান, নৈতিকতা, দয়া, ন্যায় ও আত্মসংযম—এই গুণগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি পূর্ণ মানবিক চরিত্র মানবজাতির চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা। ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই আকাঙ্ক্ষার সর্বোচ্চ ও পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন। তিনি কেবল মুসলমানদের ধর্মীয় নেতা নন; বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য এক অনন্য আদর্শ ও আলোকবর্তিকা। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি। (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)

পবিত্র কোরআন তাকে ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ বা সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণা কোনো আবেগপ্রসূত দাবি নয়, বরং ঐতিহাসিক সত্য, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং মানবসমাজে তার প্রভাবের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ থেকে উৎসারিত এক গভীর সত্য। নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবন ও কর্ম এমনভাবে সংরক্ষিত ও প্রমাণিত যে ইতিহাসে আর কোনো ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। তার আদর্শের সর্বজনীনতা এবং ব্যবহারিক পরিপূর্ণতাই তাকে মানবজাতির একমাত্র আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

একজন ব্যক্তিকে যদি বিশ্বজনীন আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হয়, তবে তার মধ্যে কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় থাকা অপরিহার্য। প্রথমত, তার জীবনচরিত ও কার্যকলাপ নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে সংরক্ষিত থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, তার বার্তা ও জীবনব্যবস্থা কেবল একটি জাতি বা গোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ না হয়ে সমগ্র মানবজাতির উপযোগী হতে হবে। তৃতীয়ত, তাঁর আদর্শ মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র—ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আধ্যাত্মিক—সবখানে পূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম হতে হবে। ইসলামের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই তিনটি শর্তই নিখুঁতভাবে পূরণ করেছেন।

নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ইতিহাস এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার জন্ম, শৈশব, কৈশোর, পারিবারিক জীবন, ব্যবসায়িক আচরণ, রাষ্ট্র পরিচালনা, যুদ্ধ ও শান্তি—এমনকি তার ব্যক্তিগত অভ্যাস, হাসি-কান্না, ইবাদত, নীরবতা—সবকিছুই নির্ভুল সূত্রে লিপিবদ্ধ হয়েছে। হাদিস ও সিরাতশাস্ত্র এমন এক শক্তিশালী যাচাই-পদ্ধতির মাধ্যমে সংরক্ষিত, যা ইতিহাসে তুলনাহীন। ফলে নবীজির জীবন কোনো কিংবদন্তি নয়, বরং বাস্তব, পরীক্ষিত ও গ্রহণযোগ্য এক ঐতিহাসিক সত্য।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার বার্তার সর্বজনীনতা। আল্লাহ ‘বিশ্বজগতের জন্য’ বলেছেন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট জাতি, অঞ্চল বা বংশের জন্য প্রেরিত হননি। তার আহ্বান ছিল সমগ্র মানবজাতির প্রতি—ধনী-গরিব, শাসক-শাসিত, নারী-পুরুষ, কালো-সাদা সকলের জন্য সমান। তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন, বংশ বা শক্তির ভিত্তিতে নয়। মানবসমাজে তিনি সাম্য, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদার যে ভিত্তি স্থাপন করেছেন, তা আজকের আধুনিক মানবাধিকার ধারণারও বহু আগে প্রণীত।

নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদর্শের তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর পরিপূর্ণ ব্যবহারিকতা। অনেক মহৎ চিন্তাবিদ ও দার্শনিক আদর্শের কথা বলেছেন, কিন্তু তাদের জীবনে সেই আদর্শের পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখা যায় না। আবার অনেক সাধক আত্মিক উৎকর্ষে অনন্য হলেও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তাদের দৃষ্টান্ত সীমিত। নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই দুই জগতের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন। তিনি যেমন গভীর আত্মিক সাধনার প্রতীক, তেমনি বাস্তব জীবনের কঠিন সমস্যার সমাধানকারী দক্ষ পথপ্রদর্শক।

তিনি ছিলেন পিতা, স্বামী, প্রতিবেশী, বন্ধু, শিক্ষক, বিচারক, সেনানায়ক ও রাষ্ট্রপ্রধান—সব ভূমিকায়ই ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়পরায়ণ। পারিবারিক জীবনে তিনি ভালোবাসা ও সহনশীলতার আদর্শ স্থাপন করেছেন। সমাজজীবনে তিনি দুর্বল ও নিপীড়িতের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি ন্যায়, জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধের অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রেও তিনি নৈতিকতার সীমা লঙ্ঘন করেননি—নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও নিরস্ত্র মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।

নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চরিত্রের কেন্দ্রে ছিল করুণা ও ন্যায়। তার শত্রুরাও তার সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমাকে বেছে নিয়েছেন, অহংকারের পরিবর্তে বিনয়কে গ্রহণ করেছেন। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করেছেন। এই চরিত্রই তাকে কেবল ধর্মীয় নেতা নয়, বরং মানবিক আদর্শে উন্নীত করেছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদর্শ কোনো নির্দিষ্ট যুগে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি, সভ্যতা ও সামাজিক কাঠামো বদলালেও মানুষের মৌলিক চাহিদা, নৈতিক সংকট ও আত্মিক শূন্যতা একই রয়ে গেছে। তার শিক্ষা আজও মানুষের আত্মিক শান্তি, সামাজিক ন্যায় ও মানবিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। আধুনিক বিশ্বের ব্যক্তি-কেন্দ্রিকতা, ভোগবাদ ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিপরীতে তার আদর্শ এক শক্তিশালী বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।

সবশেষে বলা যায় ইসলামের নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোনো কল্পিত আদর্শ নন, বরং ইতিহাসের বুকে বাস্তবায়িত এক পূর্ণ মানবিক মডেল। তার জীবন আমাদের শেখায়—কীভাবে বিশ্বাসকে কর্মে রূপ দিতে হয়, কীভাবে ক্ষমতার সাথে ন্যায়কে যুক্ত করতে হয়, কীভাবে ব্যক্তিগত উন্নতির সাথে সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ কারণেই তিনি কেবল মুসলমানদের নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য একমাত্র পরিপূর্ণ আদর্শ।

ওএফএফ