জাতীয়

পোস্টারহীন নির্বাচনে ছাপাখানার ‘শতকোটি টাকার’ ব্যবসায় ধস

  নির্বাচন কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার ব্যবসা হয় ছাপাখানায় আগে কাগজ কিনে বিপাকে অনেক ছাপাখানা

নির্বাচন এলেই রাস্তার মোড়, অলিগলির দেওয়াল কিংবা গাছও ছেয়ে যেত পোস্টারে। প্রথমবার সেই চিরাচরিত দৃশ্য দেখা যাবে না পথেঘাটে। নির্বাচনি আচরণবিধিতে সব ধরনের পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পাড়া-মহল্লার অধিবাসীদের জন্য বিষয়টি স্বস্তির হলেও কমিশনের এমন সিদ্ধান্তে মাথায় হাত ছাপাখানা ব্যবসায়ীদের।ছাপাখানার মালিক-শ্রমিকরা বলছেন, রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরু হচ্ছে। কিন্তু তাদের হাতে কোনো কাজ নেই। পোস্টার ছাপানোর কোনো অর্ডারও পাননি তারা। কেউ কেউ কয়েক লাখ টাকার কাগজ কিনে বসে আছেন। নির্বাচন সামনে রেখে যে শতকোটি টাকার পোস্টার ছাপানোর ব্যবসা হয়, তা এবার পুরোপুরি বন্ধ। রীতিমতো ধস নেমেছে।পোস্টার নিয়ে কী আছে আচরণবিধিতেআচরণবিধিতে সংশোধন এনে গত ১০ নভেম্বর গেজেট জারি করে নির্বাচন কমিশন। নতুন এ আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচন থেকে ভোটের প্রচারণায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। ফলে এবারই প্রথমবারের মতো পোস্টার ছাড়া নির্বাচনি প্রচারণায় নামছেন প্রার্থীরা।

তবে পোস্টারের ব্যবহার বন্ধ করলেও প্রার্থীরা লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ব্যবহার করতে পারবেন। এসব লিফলেট, বিলবোর্ড বা ফেস্টুনে রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহার করা যাবে না।জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে আমরা মতামত নিয়েছিলাম। পোস্টার ব্যবহার বন্ধের বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। শুধু একটি রাজনৈতিক দল বিরোধিতা করেছে। আমরা বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছি। পাশাপাশি পরিবেশবিদ ও সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকেও আপত্তি এসেছে। এজন্য নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’ছাপাখানা পাড়ায় নিস্তব্ধতা, মুখভার ব্যবসায়ীদেররাজধানীর অধিকাংশ ছাপাখানা ফকিরাপুল ও পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকায়। ফকিরাপুলেই বেশি পোস্টার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ছাপার কাজ হয়। কিন্তু নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা সামনে রেখে গত কয়েকদিন এ এলাকার ছাপাখানা ঘুরে অনেকটা নিস্তব্ধ দেখা গেছে। অলস সময় কাটছে শ্রমিকদের, ব্যবসায়ীদেরও মুখভার। গত ১৯ ও ২০ জানুয়ারি ফকিরাপুল ও বাংলাবাজার এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।ফকিরাপুলের ছাপাখানা পাড়ায় প্রবেশ করেই হাতের বামপাশে পড়ে ঝর্না প্রিন্টিং প্রেস। এ প্রেসে অন্তত ১০টি শিট মেশিন। সবগুলোই বন্ধ। ১২-১৩ জন শ্রমিকের সময় কাটছে গল্প-আড্ডায়।প্রেসের মেশিন অপারেটর রাকিব হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বসে আছি, কাজ নেই। ভোটের কাজ আসবে শুনছি। কিন্তু এ পর্যন্ত একটা কাজও পাইনি। মালিকের মন-মেজাজ খারাপ। এক সপ্তাহ প্রেসে আসেন না।’

ঝর্না প্রেসের বিপরীত দিকে সাকিব আর্ট অ্যান্ড প্রিন্ট নামে আরেকটি ছাপাখানা। সেখানেও ৯-১০ জন শ্রমিক। তাদের হাতেও কাজ নেই। সকাল গড়িয়ে বিকেল হলেও মেশিন চালু করতে পারেননি বলে জানান সাকিব আর্ট অ্যান্ড প্রিন্টের মেশিন অপারেট হাসিবুল আলম। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে ৮-১০ লাখ টাকার কাজ হইবো—এমন টার্গেট আছিল। কিন্তু দেহি তো না কিছুই। আইজকাও যদি কেউ অর্ডার না করে, কবে করবো? এবার আর হইবো না।’ফকিরাপুল ছাপাখানার গলিতে সামনে এগোলেও প্রায় সব প্রেসেই মেশিন বন্ধ দেখা যায়। যে দু-একটি প্রেসের মেশিন চলছে, সেখানে গিয়ে দেখা যায়, হয়তো কোনো কোচিং সেন্টারের প্রচারপত্র অথবা গাইড বই ছাপার কাজ চলছে। কোথাও পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ছাপার কাজ চোখে পড়েনি।ছাপাখানা পাড়া বলে পরিচিত গলির শেষপ্রান্তে গিয়ে চোখে পড়ে ১১টি শিট মেশিনের বেশ বড় একটি প্রেস। প্রবেশপথে বসে আছেন মালিক রেজওয়ান খান। দাদার হাতে গড়া চৌধুরী প্রেস অ্যান্ড বাইন্ডিংয়ের দেখভাল করছেন তিনি। প্রায় ৩৬ বছরের মুদ্রণ ব্যবসায়ী তারা।রেজওয়ান খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘শুনছি এবার কেউ পোস্টার ছাপাবে না। নির্বাচনে নাকি পোস্টার নিষেধ। নির্বাচন যে আসছে, এটা প্রেস পাড়ায় কেউ জানেই না! কোনো ভোটের কাজ নেই। এমন হলে তো ভোটের মৌসুমেও লোকসান গুনতে হবে।’পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরার গল্প শুনিয়ে রেজওয়ান বলেন, ‘আমাদের ৩৬ বছরের ব্যবসা। দাদা দোকানটা করেছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর বাবা চালাতেন। দুই বছর হলো বাবা অসুস্থ। আমাকেই ব্যবসা চালাতে হচ্ছে। ১৮ জানুয়ারি রাতে আব্বা জানতে চাইলেন ভোটের কাজ কিছু আসছে কি না। আমি বললাম না। এটা শুনে আব্বা খুবই অবাক হয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘শুনেছি, এর আগে জাতীয় নির্বাচন, উপজেলা, ইউনিয়ন কিংবা পৌর নির্বাচনে ১০-১২ লাখ টাকার কাজ এমনিই হয়। কিন্তু এবার এক টাকার কাজও পাইনি। এখন শুনছি পোস্টার নিষেধ। তাহলে তো আর আশাও নেই।’কাগজ কিনে বসে আছি, অর্ডার পাচ্ছি নানির্বাচন কমিশন ভোটের প্রচারে পোস্টার নিষিদ্ধ করেছে—এমন তথ্য জানেন না অধিকাংশ ছাপাখানা মালিক। পোস্টার ছাপার কাজ পাওয়ার আশায় আগেভাগেই কাগজ কিনে রেখেছেন তারা। অনেকে চড়া দামে এ কাগজ কিনেছেন। কিন্তু কাজের অর্ডার মিলছে না। এতে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন তারা।পোস্টার ছাপার কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ অফসেট পেপার এবং লিফলেটের জন্য আর্ট পেপার কিনেছেন প্রিন্ট সিটির মালিক সাইফুল ইসলাম আজম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কাজ আসবে ভেবে কয়েক হাজার রিম অপসেট পেপার কিনেছি। বাজারে দাম কিছুটা বেশি ছিল, তাও কিনেছি। কারণ কাজ শুরু হয়ে গেলে দামটা আরও বেড়ে যাবে ভেবে। কিন্তু একটা কাজের অর্ডারও পাইনি। এখন যদি পোস্টার ছাপার কাজ না পাই, তাহলে এ কাগজ পড়ে থাকবে। সামনে বড় ধরনের কোনো কাজের মৌসুমও নেই। দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে কাগজ ড্যাম হয়ে যাবে। পুরো কাগজ কেনার টাকা পানিতে যাবে।’

আল-সাবা প্রেস অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ের ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সাড়ে চার লাখ টাকার কাগজ কিনেছি। তফসিল ঘোষণার আগে কুমিল্লার একজন এমপি প্রার্থী কিছু পোস্টার ছাপিয়েছিলেন। এরপর পোস্টার, লিফলেট—কোনো কিছুই ছাপার কাজ পাইনি। যদি পোস্টার টাঙানোই নিষেধ হয়, তাহলে কাজ হবেও না। এত টাকার কাগজ পড়ে থাকবে। বড় ধরনের লস (লোকসান) হয়ে গেলো এবার।’শতকোটি টাকার ব্যবসায় ‘ধস’রাজধানীর ফকিরাপুর, পল্টন, আরামবাগ ও পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকায় দুই সহস্রাধিক ছাপাখানা রয়েছে। এর মধ্যে ফকিরাপুল, পল্টনে অন্তত হাজারখানেক ছাপাখানা। এসব ছাপাখানা নির্বাচনি পোস্টার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ব্যানার-ফেস্টুন ছাপানোর কাজ বেশি করে।নির্বাচনের মৌসুমে শুধু ঢাকার ছাপাখানাগুলোতে একশ কোটি টাকার ওপরে ব্যবসা হয়। নির্বাচনি পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় সেই ব্যবসায় পুরোপুরি ধস নেমেছে বলে জানান বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার তো সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। এজন্য এ কেন্দ্রিক বড় ব্যবসা গড়ে উঠেছে। শিট মেশিনে যারা কাজ করেন, তারা মূলত পোস্টার-লিফলেট ছাপার কাজই বেশি করেন। তারা এবার বড় ধরনের ধাক্কা খাবেন, লোকসানে পড়বেন।’

তোফায়েল খান বলেন, ‘নির্বাচনে শুধু ঢাকার প্রেসগুলোতেই শতকোটি টাকার ব্যবসা হয় বলে জেনেছি। যদি শুধু লিফলেট-হ্যান্ডবিল ছাপা হয়, তাহলে সেটার বাজার ১০ কোটিরও নিচে নামবে। শুধু ছাপার হিসাব নয়, এগুলো পরিবহন ও সরবরাহের কাজেও শ্রমিকরা আর্থিকভাবে লাভবান হন। সেই পথও বন্ধ হয়ে গেলো।’পোস্টারবিহীন প্রচারে কেমন হবে ভোটের ‘আমেজ’ নির্বাচনে বিভিন্ন সময় পোস্টার টাঙানো নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও কখনোই পোস্টারের ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল না। এবারই প্রথম পোস্টারবিহীন প্রচারে নামছেন প্রার্থীরা। এতে ভোটের হাওয়ায় ভিন্ন আমেজ দেখা যাবে বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক এ অধ্যাপক জাগো নিউজকে বলেন, ‘পোস্টার ব্যবহার আমাদের দেশে নির্বাচনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু ইসি এবার সেটা নিষিদ্ধ করেছে। এটা খারাপভাবে দেখার সুযোগ নেই। প্রচারের ধরন তো পাল্টে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার বাড়ছে।’তিনি বলেন, ‘পোস্টার না থাকলে যে নির্বাচনি আমেজ থাকবে না, তা কিন্তু নয়। তবে প্রথমবার যেহেতু এবার নিষিদ্ধ হচ্ছে, ফলে মানুষের মনে খটকা লাগবে। নির্বাচন নির্বাচন আমেজটা পথেঘাটে বেরোলে হয়তো আসবে না। এটা থেকে মানুষ এও ভাববে যে, আসলেই সব সংস্কৃতিতে বদল আসছে, টিকে থাকতে হলে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এটাও পোস্টারে প্রচার ছাড়া নির্বাচনের নতুন বার্তা হতে পারে।’এএএইচ/এএসএ