চাল, আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম—দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব কৃষিপণ্যের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং অদক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনাই প্রধান কারণ বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ভ্যালু চেইন ইফিসিয়েন্সি অব এগ্রিকালচারাল প্রডাক্টস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। সেখানে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন গবেষণা দলের প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের পরিচালক সেলিম আল মামুন।
দুই ধাপে গবেষণা, ১৮ জেলার মাঠতথ্যবাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, গবেষণাটি দুই ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথম ধাপ ২০২৫ সালের ৫–১৬ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় ধাপ ১৫ জুন থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত। এ সময়ে ১৮ জেলার ৬১টি উপজেলায় পারপাসিভ র্যান্ডম স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে ৪২৬ জন উত্তরদাতার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আগস্টে গবেষণা প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, বোরো মৌসুমে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের গড় খরচ ৮৭২ টাকা হলেও তারা ধান বিক্রি করেছেন ১ হাজার ১২৫ থেকে ১ হাজার ৪৫০ টাকায়। কৃষক পর্যায়ে কিছু লাভ থাকলেও চালের বাজার কার্যত মিলারনির্ভর হয়ে পড়েছে।
কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি চালের দাম যেখানে ৫০ টাকা, সেখানে খুচরা বাজারে তা বেড়ে ৫৮ দশমিক ৫০ টাকায় পৌঁছায়। চালের পাশাপাশি তুষ ও কুঁড়া বিক্রি করে মিলাররা প্রতি মণে গড়ে অতিরিক্ত ১০৬ টাকা আয় করেন, যা ভোক্তা পর্যায়ে দামের চাপ বাড়ায়।
আলুর দামে বড় চাপ হিমাগার পর্যায়েআলুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি ঘটে হিমাগার পর্যায়ে। কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ১০ দশমিক ৬৩ টাকা হলেও কৃষকরা বিক্রি করেন ১৮ দশমিক ৪৪ টাকায়। হিমাগার থেকে বের হওয়ার সময় দাম দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ৮০ টাকা, যা খুচরা বাজারে গিয়ে ৪৫ দশমিক ৮০ টাকায় পৌঁছায়।
গবেষণায় বলা হয়, হিমাগার গেট থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফাই আলুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি কেজিপ্রতি ৬ দশমিক ৭৫ টাকা পর্যন্ত হিমাগার ভাড়া কমানোর সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পেঁয়াজের বাজারে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ওজন হ্রাস। কৃষক পর্যায়ে কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ১৯ দশমিক ২৪ টাকা, বিক্রয়মূল্য ৪৬ দশমিক ৯৪ টাকা এবং খুচরা বাজারে দাম ৮০ দশমিক ৭৫ টাকা।
দীর্ঘ সময় বাড়িতে সংরক্ষণের ফলে প্রতি মণ পেঁয়াজে প্রায় ১২ কেজি পর্যন্ত ওজন কমে যায়। এতে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে সরবরাহ সংকট তৈরি হয় এবং দাম কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় ওঠার ঝুঁকি থাকে। তবে গবেষণায় পেঁয়াজের বাজারে কোনো সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকটের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ব্রয়লার মুরগি ও ডিমে খামারিদের লোকসানব্রয়লার মুরগির উৎপাদনে খামারিরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকি নিলেও লাভ খুবই সীমিত। কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ১৬৩ দশমিক ৫৩ টাকা, খামারির বিক্রয়মূল্য ১৭২ দশমিক ১৮ টাকা এবং খুচরা বাজারে দাম ১৯৫ দশমিক ৩৩ টাকা। মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশই ফিডের পেছনে যায়। জরিপ চলাকালে অনেক খামারি কেজিপ্রতি ১২ টাকা পর্যন্ত লোকসানে পড়েছেন।
ডিম উৎপাদনেও একই চিত্র দেখা যায়। একটি ডিমের উৎপাদন খরচ ৯ দশমিক ৪৭ টাকা, খামারির বিক্রয়মূল্য ১০ দশমিক ২৬ টাকা এবং খুচরা বাজারে দাম ১১ দশমিক ৭৭ টাকা। ডিম উৎপাদনের মোট ব্যয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই পশুখাদ্যের জন্য ব্যয় হয়। অফ-সিজনে ছোট খামারিরা লোকসানে পড়লেও বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে সুপারিশকৃষিপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—আলু ও পেঁয়াজের জন্য উন্নত ও বিকল্প সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কৃষকদের জন্য নগদ সহায়তা কার্যকর করা, পশুখাদ্যের দাম নিয়মিত মনিটরিং এবং ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য কন্ট্রাক্ট ফার্মিং মডেল চালু করা।
ইএআর/ইএ