একটি শিশুর দিকে তাকালেই কেন যেন অজান্তে মন নরম হয়ে আসে। বড় বড় চোখ, গোলগাল গাল, ছোট্ট একটা নাক – দেখলেই আদর করতে ইচ্ছা করে! কিন্তু দেখেই কেন তাকে কোলে নিতে, আদর করতে ইচ্ছে করে? বিষয়টি শুধু আবেগ নয়, বরং পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত।
মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘বেবি স্কিমা’। প্রথম এই ধারণাটি দেন অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী কনরাড লরেঞ্জ। তার মতে, শিশুর মুখের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য - যেমন বড় চোখ, গোল মাথা, ছোট মুখ - মানুষের মস্তিষ্কে স্বাভাবিকভাবেই যত্ন নেওয়ার প্রবণতা তৈরি করে। এটি প্রকৃতির তৈরি এক ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা।
নিউরোসায়েন্স বলছে, আমরা যখন এই ধরনের মুখ দেখি, তখন মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ডোপামিন ও অক্সিটোসিন নামের হরমোন নিঃসৃত হয়। ডোপামিন আনন্দ ও প্রেরণার সঙ্গে যুক্ত, আর অক্সিটোসিন সম্পর্ক, ভালোবাসা ও বন্ধনের অনুভূতি তৈরি করে। ফলে শিশুকে খাওয়ানো, আগলে রাখা বা শান্ত করার কাজগুলো আমাদের কাছে কষ্টকর নয়, বরং মানসিকভাবে তৃপ্তিদায়ক মনে হয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শিশুর মুখে এই বৈশিষ্ট্য যত স্পষ্ট হয়, প্রাপ্তবয়স্কদের সাড়া তত বেশি শক্তিশালী হয়। এমনকি শিশুটি কাঁদলেও বা বিরক্ত করলেও, বড়রা সহজে তাকে উপেক্ষা করতে পারেন না। এই প্রবল সাড়া শিশুর জন্য জরুরি, কারণ জন্মের পর তার টিকে থাকার দায়িত্ব পুরোপুরি থাকে বড়দের ওপর।
শিশুরা যখন আদর, স্পর্শ ও মনোযোগ পায়, তখন তাদের মস্তিষ্কে স্ট্রেস রেগুলেশন সিস্টেম শেখে। এতে নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়ে এবং ভবিষ্যতে সম্পর্ক গড়ে তোলার ভিত্তি মজবুত হয়। অর্থাৎ শিশুর মুখের প্রতি আমাদের স্বাভাবিক টান শুধু বর্তমান নয়, তার সারাজীবনের মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িত।
অভিভাবকদের জন্য এটি বোঝা জরুরি - আপনার বারবার কোলে নিতে ইচ্ছে করা, কাঁদলে অস্থির হয়ে পড়া বা অতিরিক্ত যত্নশীল হয়ে ওঠা দুর্বলতা নয়। এটি মানুষের মস্তিষ্কের প্রাচীন ও শক্তিশালী একটি প্রোগ্রাম। এই বিষয়টি বুঝে শিশুর প্রয়োজনের প্রতি সচেতনভাবে সাড়া দিলে সম্পর্ক আরও গভীর হয় এবং শিশুর মানসিক বিকাশ আরও সুস্থ পথে এগোয়।
সূত্র: কনরাড লরেঞ্জের ‘বেবি স্কিমা’ তত্ত্ব, জার্নাল অব নিউরোসায়েন্স, ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজি ও অক্সিটোসিন
এএমপি/জেআইএম