ফিচার

‘জয়নগরের মোয়া’ কেন এত জনপ্রিয়

ফাত্তাহ তানভীর রানা

মিষ্টির মতো দেখতে হলেও মিষ্টি নয়। কিছুটা মোয়ার মতোও দেখতে লাগে! মুখে দিতেই গলে গেল। অনিন্দ্য অনুভূতি। তবে স্বাদ কিছুটা মিষ্টির মতো হলেও এটি খই, গুড়, বাদাম ও কিসমিসের ফ্লেভার মেলানো স্বাদযুক্ত। কি যেন খেলাম? প্রথম দেখা, কলকাতার বউ বাজারে একটা পুরোনো মিষ্টির দোকানে। হলুদাভ বা সাদাটে ভাবের গোলাকার সাইজ, মাঝে খই আর বাদামের মিশ্রণ।

দ্বিতীয়বার দেখি, ডায়মন্ড হারবারের একটা দোকানে। সুস্বাদু ও দৃষ্টিনন্দন এই খাবারের নাম ‘জয়নগরের মোয়া’। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম জয়নগর হবে যেতে, সুন্দরী মোয়া খেতে। খেলাম মোয়া একবার, মন চাইলো খাই আরেকটা বার! জয়নগরের মোয়া একটি ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু মিষ্টান্ন জাতীয় খাবার যা শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক বাজারেও বাঙালির শীতকালীন ভোজনে রসনা যুক্ত করে।

জয়নগর গ্রামেই ‘ঈশ্বরের কন্ঠখ্যাত’ হেমন্তে মুখোপাধ্যায়ের পুর্বপুরুষের ভিটা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাশের গ্রামেই পূর্ববাংলা থেকে আসেন মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্বজনরা। এবার চলুন জয়নগরের মোয়া খেয়ে আসি! জয়নগরের মোয়া ভারতের জিআই স্বীকৃতি প্রাপ্ত পণ্য।

একটি অনুষ্ঠানে জয়নগর শহরের কাছাকাছি বহরু গ্রামের জনৈক যামিনীবুড়ো নিজের ক্ষেতে উৎপাদিত কনকচূড় ধানের খই ও নলেন গুড় দিয়ে মোয়া প্রস্তুত করে সবাইকে পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুগাবতার শ্রীচৈতন্যদেব। তিনি মোয়া খেয়ে বেশ সুনাম করেন। তখন থেকে ক্রমেই এই মোয়া জয়নগর শহরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯২৯ সালে পূর্ণচন্দ্র ঘোষ ওরফে বুঁচকিবাবু এবং নিত্যগোপাল সরকার জয়নগর শহরে তাদের মোয়া তৈরির কারখানা ও দোকান স্থাপন করেন। তাদেরকে জয়নগরের মোয়ার বাণিজ্যিক বিপণনের পথিকৃৎ বলে ধরা হয়। শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার নামের দোকান পূর্ণ চন্দ্র ঘোষের চতুর্থ প্রজন্ম ও আত্মীয়রা চালাচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

জয়নগরের মোয়া তৈরির প্রধান উপাদান কনকচূড় ধানের খই, নলেন গুড় ও গাওয়া ঘি। এছাড়াও ক্ষীর, পেস্তা, এলাচি, কাজুবাদাম, কিসমিস, সুগন্ধি ও পোস্ত সময়ের চাহিদা অনুসারে ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার কুলপি, কাকদ্বীপ ও নামখানা অঞ্চলের প্রায় ৪০০ বিঘা জমিতে কনকচূড় ধানের চাষ করা হয়। নলেন গুড়ের একমাত্র উৎস খেজুর গাছ। শীতকালে গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন। সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের খেজুর রস পাওয়া যায় জিরেন কাঠ থেকে। অর্থাৎ যে খেজুর গাছকে কয়েকদিন বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে এমন গাছ থেকে ভালো রস মেলে। জিরেন কাঠ থেকে রস সংগ্রহ করে, ঢিমে আঁচে জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় নলেন গুড়। জয়নগরের মোয়া শুধু শীতকালেই তৈরি ও বিক্রয় করা হয়।

বর্তমানে কলকাতা শহর, রেল, বাসসহ বিভিন্ন স্থানে জয়নগরের মোয়া বিক্রি হয়। আদৌ সেগুলো জয়নগরের মোয়া কি না তা নিয়ে সন্দেহ অমূলক নয়। বিভিন্ন স্থানে তৈরি করে, জয়নগরের মোয়া বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। আলোচিত মোয়াগুলো তেমন মানসম্মত নয়। নিম্নমানের নলেন গুড়, খই, ঘি, দুধ, বাদামসহ নানান উপকরণ দিয়ে তৈরি করা মোয়াগুলো ভোক্তার জন্য ক্ষতিকর বটে। জয়নগরের বাইরেও উৎকৃষ্ট উপকরণ দিয়ে তৈরি ‘জয়নগরের মোয়া’ সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর। মোয়ার প্রকৃত স্বাদ পেতে হলে, মোয়া শীতকালে কিনতে হবে এবং সুপরিচিত দোকান থেকে মোয়া কিনতে হবে।

আমি মোয়া কিনেছিলাম ‘মা কালী সুইটস’ থেকে। এই মিষ্টির দোকানের যাত্রা ষাটের দশকে। এখন চালাচ্ছেন বুদ্ধদেব ঘোষ, যিনি দ্বিতীয় প্রজন্ম। তার পিতা রণজিৎ কুমার ঘোষের কাছ থেকে পেলেও মূল মোয়ার ব্যবসা শুরু করেন জেঠু জগন্নাথ। ‘মা কালি সুইটস’ এর লোগো রয়েছে। জয়নগর মজিলপুর বাজারে কম-বেশি দশটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে মোয়া তৈরির লাইসেন্স বা অনুমতি বা স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যাদের পণ্য মানসম্মত। এদের মোয়া আমার বেশ সুস্বাদু মনে হয়েছে। ভালো মোয়া খেতে চাইলে প্রতি পিস ২০ টাকা থেকে শুরু হয়। আরও বেশি মূল্যমানের মোয়া রয়েছে। যা আকারে বড় ও সুস্বাদু।

জয়নগর যেতে হলে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনে যেতে হবে। নামখানাগামী লোকাল ট্রেনে জয়নগর মজিলপুর স্টেশনে নামতে হবে। তারপর কাছেই বাজারে বেশ কিছু মোয়ার দোকান রয়েছে। কলকাতা শহরের জয়নগরের মোয়ার চেয়ে জয়নগর মজিলপুরের ‘জয়নগরের মোয়া’ মানে ভালো হবে। আদি ও অকৃত্রিম স্বাদ; যা অতুলনীয়।

লেখক: ব্যাংকার ও গল্পকার আরও পড়ুনবিয়েতে পুরুষত্বের প্রমাণ দিতে সহ্য করতে হয় চাবুকের আঘাতনতুন প্রজন্ম জানে না শহীদ আসাদের ইতিহাস!

কেএসকে/এমএস