বয়ঃসন্ধিকাল ও তারুণ্য এমন এক সময় যখন ‘আমি কে’-এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় মানদণ্ড। এ সময় বন্ধুবান্ধবের মতামত, অভ্যাস ও জীবনযাপন কিশোর-কিশোরীদের উপর এমন প্রভাব ফেলে, যা অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা বা শিক্ষকদের কথাকেও ছাপিয়ে যায়।
এই সমবয়সীদের চাপ কিশোর-কিশোরীদের খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, শরীরচর্চা এমন কি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার ধরনও পরিবর্তন করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণরা কী খায়, কতটা ঘুমায় বা নিজের শরীর ও মনের প্রতি কতটা যত্নবান হবে-এই সিদ্ধান্তগুলো খুব কমই একা নেওয়া হয়। সামাজিক পরিসরে যা ‘স্বাভাবিক’ বা ‘কুল’ বলে বিবেচিত হয়, সেটাই ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত পছন্দে রূপ নেয়। অনেক সময় এই পরিবর্তন সচেতন সিদ্ধান্তের ফল নয় বরং বাদ পড়ে যাওয়ার ভয় থেকে তৈরি হওয়া এক ধরনের মানসিক সমঝোতা।
সাইকোলজিস্ট ডা. গৌরী রাউতের মতে, ক্ষতিকর আচরণের পেছনে অধিকাংশ সময় ইচ্ছা নয়, বরং অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তীব্র প্রয়োজন কাজ করে। আলাদা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কিশোর-কিশোরীরা স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলো উপেক্ষা করতে বাধ্য করে। একই সুরে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হামজা হুসেন বলেন, সমবয়সীদের প্রভাব যেমন খেলাধুলা বা সুস্থতার দিকে টানতে পারে, তেমনি খারাপ ঘুম, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, অস্বাস্থ্যকর খাবার কিংবা ক্ষতিকর অভ্যাসের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
এই বয়সে কিশোর-কিশোরীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পেছনে রয়েছে জৈবিক ও সামাজিক বাস্তবতা। মস্তিষ্কের যে অংশ দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অংশ (প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স) তখনও পুরোপুরি বিকশিত হয় না। এছাড়া ঝুঁকি মূল্যায়নের সঙ্গে জড়িত, তা তখন সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হয় না। অন্যদিকে আবেগ ও তাৎক্ষণিক পুরস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত অংশগুলো থাকে অত্যন্ত সক্রিয়। ফলে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকির চেয়ে তাৎক্ষণিক সামাজিক স্বীকৃতি অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
সমস্যা আরও জটিল হয় যখন পরিবারকে ছাপিয়ে বন্ধুরাই হয়ে ওঠে প্রধান রেফারেন্স গ্রুপ। সীমিত অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাখ্যানের ভয় তরুণদের নিজের মূল্যবোধের চেয়ে ‘ফিট ইন’ করাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তখনই দেখা দেয় আচরণগত পরিবর্তন-ঘুম বা খাওয়ার ধরনে হঠাৎ রদবদল, পরিবার থেকে দূরে সরে যাওয়া, অস্বাভাবিক গোপনীয়তা বা অকারণে বিরক্ত হয়ে ওঠা। কখনো কখনো অতিরিক্ত ডায়েটিং, ব্যায়াম বা ক্ষতিকর অভ্যাসও গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের হাতিয়ার হয়ে যায়। মেজাজের পরিবর্তন, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া বা অসুস্থতাও সমবয়সীদের নেতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত দিতে পারে।
তবে সমবয়সীদের চাপ সব সময় নেতিবাচক নয়। সঠিক পরিবেশে এই একই প্রভাব সুস্থতার পক্ষে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে ব্যায়াম করা, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা বা স্বাস্থ্যকর অভ্যাসকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া-এসবই ইতিবাচক বন্ধুত্বদের সংস্কৃতির উদাহরণ।
অস্বাস্থ্যকর চাপ মোকাবিলার জন্য বিশেষজ্ঞরা জোর দেন আত্মসম্মান ও স্পষ্টতার উপর। সব সময় সংঘাতের প্রয়োজন নেই,অনেক সময় শান্ত কিন্তু দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলাই যথেষ্ট। নিজের সীমারেখাকে সম্মান করা এবং প্রত্যাখ্যানকে দুর্বলতা নয়, বরং আত্মসম্মানের অংশ হিসেবে দেখাই তরুণদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
এই মানসিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠে অনেক আগেই-পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকার মধ্য দিয়ে। খোলামেলা যোগাযোগ, বাস্তবসম্মত উদাহরণ এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তরুণদের নিজেদের পছন্দ নিয়ে নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করে। স্কুলে পরিস্থিতিভিত্তিক অনুশীলন, নেতৃত্বমূলক কার্যক্রম ও মননশীলতা চর্চা বাস্তব জীবনের সামাজিক চাপ সামলানোর প্রস্তুতিও গড়ে তোলে।
তাই বলা যায়, সমবয়সীদের চাপ এড়িয়ে যাওয়ার কিছু নয়-বরং তা বোঝা ও সচেতনভাবে সামলানোই সুস্থতার চাবিকাঠি। কারণ সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে, এই চাপই একদিন হয়ে উঠতে পারে সুস্থ জীবনের প্রেরণা।
সূত্র: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
আরও পড়ুন: শিশুদের এত কিউট লাগে কেন জানেন? সন্তানের সঙ্গে সংঘাত ও যুদ্ধ নিয়ে কথা বলার পরামর্শ দিলো ইউনিসেফ
এসএকেওয়াই/