বিশ্বের প্রতিটি সংস্কৃতিতেই বিয়ে শুধু দুটি মানুষের মিলন নয়, বরং দুটি পরিবার, দুটি বিশ্বাস ও দুটি জীবনের একত্র যাত্রা। এই যাত্রার সূচনালগ্নে নানান দেশে নানান ধরনের প্রতীকী রীতি পালিত হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় তেমনই একটি ব্যতিক্রমী ও অর্থবহ বিয়ের রীতি হলো বরের পক্ষ থেকে কনের মায়ের হাতে একজোড়া পুতুল হাঁস উপহার দেওয়া। ছোট এই উপহারটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে স্বামী হিসেবে বর-এর আনুগত্য, দায়িত্ববোধ ও আজীবন একসঙ্গে থাকার অঙ্গীকার।
কোরিয়ান সমাজে বিয়েকে অত্যন্ত গম্ভীর ও দায়িত্বপূর্ণ একটি বন্ধন হিসেবে দেখা হয়। এখানে ভালোবাসার পাশাপাশি বিশ্বস্ততা ও পারিবারিক দায়বদ্ধতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পুতুল হাঁস উপহারের রীতিটি সেই মূল্যবোধেরই একটি দৃশ্যমান প্রতিফলন।
কোরিয়ান ভাষায় এই হাঁসকে বলা হয় ‘কিরোগি’। এটি মূলত বন্য রাজহাঁস। এই প্রজাতির হাঁস বা রাজহাঁস সারাজীবন মাত্র একজন সঙ্গীর সঙ্গে থাকে। যদি কোনো কারণে তার সঙ্গী মারা যায়, তবে সে আর নতুন সঙ্গী গ্রহণ করে না। এই বৈশিষ্ট্য থেকেই কোরিয়ান সংস্কৃতিতে হাঁসকে চিরস্থায়ী ভালোবাসা ও একনিষ্ঠতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রাচীন কোরিয়ান সমাজে বিবাহ ছিল মূলত একটি সামাজিক চুক্তি। সেখানে বিবাহ বিচ্ছেদ বা বিশ্বাসঘাতকতা ছিল অত্যন্ত নিন্দনীয়। সেই সময় থেকেই বিয়েতে হাঁসের প্রতীক ব্যবহার শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে পুতুল হাঁস উপহারের রীতিতে রূপ নেয়। এই রীতির মাধ্যমে বর তার ভবিষ্যৎ স্ত্রীকে নয়, বরং তার পরিবারকে বিশেষ করে মাকে নিজের চরিত্র ও মানসিকতার প্রমাণ দেয়।
এই রীতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো পুতুল হাঁস সরাসরি কনেকে না দিয়ে কনের মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কোরিয়ান সমাজে মেয়ের মা-ই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত হন। মেয়ের জন্ম থেকে বিয়ে পর্যন্ত তার সুখ-দুঃখ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা থাকে মায়েরই।
বর যখন শাশুড়ির হাতে হাঁস তুলে দেন, তখন তিনি মূলত বলেন, ‘আপনি আপনার মেয়েকে যে বিশ্বাস নিয়ে আমার হাতে তুলে দিচ্ছেন, আমি সেই বিশ্বাস কখনো ভাঙব না।’ এটি একটি নীরব প্রতিশ্রুতি, যেখানে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা অপরিসীম।
বর্তমান কোরিয়ায় বিয়ের ধরন অনেকটাই আধুনিক হয়েছে। বিলাসবহুল ওয়েডিং হল, পশ্চিমা ধাঁচের গাউন ও স্যুট, আলোকসজ্জা সবকিছুই এখন সাধারণ। তবুও এই ঐতিহ্যবাহী হাঁস উপহারের রীতি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। অনেক পরিবার এখনো বিয়ের আগে বা আলাদা একটি ছোট পারিবারিক অনুষ্ঠানে এই রীতি পালন করে। এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় জিওনানরি। কাঠের হাঁসের বদলে এখন সিরামিক, ধাতু বা কাপড়ের তৈরি নান্দনিক হাঁস উপহার দেওয়া হয়। অনেক দম্পতি এই হাঁস নিজেদের শোবার ঘরে সাজিয়ে রাখেন, যেন প্রতিদিন তা তাদের অঙ্গীকারের কথা মনে করিয়ে দেয়।
কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী বিয়ের অনুষ্ঠানকে বলা হয় হোল্লে। এটি কনফুসিয়াস দর্শন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। এখানে ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে পারিবারিক সম্মান, সামাজিক শৃঙ্খলা ও দায়িত্বকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। হোল্লে অনুষ্ঠানে বর ও কনে আলাদা দিক থেকে প্রবেশ করেন, যা বোঝায় তারা ভিন্ন জীবন থেকে এসে এখন এক নতুন জীবনে প্রবেশ করছেন। এরপর তারা একে অপরকে পানীয় বা মদ পরিবেশন করেন, যা পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমতার প্রতীক। অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো একে অপরকে গভীরভাবে নত হয়ে অভিবাদন জানানো, যা শ্রদ্ধা ও সম্মানের প্রকাশ।
কোরিয়ান ঐতিহ্যবাহী বিয়ের পোশাকের নাম হানবক। এটি শুধু পোশাক নয়, বরং কোরিয়ান ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। কনে সাধারণত উজ্জ্বল লাল, সবুজ বা হলুদ রঙের হানবক পরেন। তার মুখে ছোট লাল বৃত্ত আঁকা থাকে, যাকে বলা হয় ইয়নজিজিমি এটি সৌভাগ্য ও সুস্থ দাম্পত্য জীবনের প্রতীক। মাথায় থাকে অলঙ্কৃত হেয়ারপিস ও গয়না। বরের পরেন থাকে গাঢ় রঙের হানবক, সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী টুপি। বরের পোশাকে সাধারণত শক্তি, দায়িত্ব ও পুরুষত্বের প্রতীক হিসেবে নকশা করা হয়।
কোরিয়ান বিয়েতে খাবার কেবল আপ্যায়নের জন্য নয়, বরং প্রতিটি পদই কোনো না কোনো প্রতীক বহন করে। চালের তৈরি কেক ডুক দীর্ঘ জীবন ও সুখের প্রতীক। জাপচে বোঝায় পারিবারিক ঐক্য ও সমৃদ্ধি। কিমচি প্রতীক শক্ত সম্পর্ক ও ধৈর্যের। ফল ও বাদাম পরিবেশন করা হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও সমৃদ্ধ জীবনের আশীর্বাদ হিসেবে। ঐতিহ্যবাহী বিয়েতে খাবার পরিবেশন করা হয় অত্যন্ত শৃঙ্খলিত ও নান্দনিকভাবে, যা কোরিয়ান সংস্কৃতির পরিমিতিবোধকে তুলে ধরে।
আজকের কোরিয়ান বিয়েতে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। কেউ হয়তো ওয়েডিং হলে গাউন পরে বিয়ে করছেন, আবার বিয়ের আগের রাতে পরিবার নিয়ে পালন করছেন হাঁস উপহারের রীতি। এতে প্রমাণ হয়, সময় বদলালেও সংস্কৃতির মূল আত্মা এখনো অটুট।
মূলত কোরিয়ার বিয়েতে পুতুল হাঁস কেবল একটি উপহার নয়। এটি ভালোবাসার নীরব ভাষা, আনুগত্যের প্রতীক এবং আজীবন একসঙ্গে থাকার অঙ্গীকার। যেখানে অনেক সংস্কৃতিতে ভালোবাসা প্রকাশ পায় শব্দে ও শপথে, সেখানে কোরিয়ান সংস্কৃতিতে একটি ছোট হাঁসই বলে দেয় সব কথা। এই রীতিই কোরিয়ান বিয়েকে করে তোলে অনন্য নীরব, সংযত, কিন্তু গভীরভাবে অনুভবযোগ্য।
আরও পড়ুনযার সংগ্রহে যত তিমির দাঁত, বিয়ের পাত্র হিসেবে সে তত এগিয়েবিয়ে এত সহজ নয়, কাঠ কেটে বর-কনেকে দিতে হয় পরীক্ষা
সূত্র: দ্য নট
কেএসকে/জেআইএম