প্রবাস

বাড়ির মালিক যখন ভাড়াটে হয়ে যায়

যে দেশে আমাদের কোনো মালিকানা নেই। আছে শুধু দায়িত্ব। আমরা রেমিট্যান্সযোদ্ধা। আজীবন কলুর বলদের মতো খেটে যাব, বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরাব, টাকা পাঠাব দেশে। সেই টাকায় রাষ্ট্র চলবে, পরিবার টিকবে, আর দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতারা রাজার হালে থাকবে।

বিনিময়ে আমরা নিজের দেশেই ভাড়াটে হয়ে বসবাস করব। নিজের জমিতে মালিক হব না, নিজের ঘরে নিরাপদ থাকব না। আর মুখ খুললেই পরিণতি হবে ভয়াবহ। কথা বললে ওসমান হাদির মতো পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। এই শোষণ কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি রাষ্ট্রের নীরব সম্মতিতে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থা। এই বাস্তবতাই আজকের বাংলাদেশ।

এই লেখা কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভের নথি নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় সতর্কসংকেত। কারণ এখানে ব্যর্থ হওয়া মানে কেবল একজন নাগরিকের পরাজয় নয়, পুরো দেশের নৈতিক পরিকাঠামোর ভাঙন। যদি এই দখলদার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এখনই দাঁড়ানো না যায়, তাহলে দুর্নীতি রাষ্ট্রের স্বাভাবিক ভাষা হয়ে উঠবে। স্বৈরাচারের পতন হবে না। বরং কীটপতঙ্গের মতো দখলদাররা বংশবিস্তার করবে, রাষ্ট্র ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যাবে, আর দেশের ধ্বংস হবে পরিকল্পিত ও অবশ্যম্ভাবী।

যা আমার সঙ্গে ঘটছে, তা কোনো ব্যতিক্রম নয়। হাজারো পরিবারের সঙ্গে প্রতিদিন একই ঘটনা ঘটছে, শুধু তাদের কণ্ঠ শোনা যায় না।

জমি আমার। খাজনা দিই আমি। অথচ ভোগ দখলে বিএনপি। আর সেই বিএনপি মানেই আমার ভাই কর্নেল হান্নান মৃধা। এই রাজনীতির শিক্ষা তারা পায় পরিবার থেকেই। জোরজুলুমের চর্চা শুরু হয় নিজের মানুষদের সঙ্গে। পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থাকলে ভয় দেখানো হয়, অনুপস্থিত থাকলে সবকিছু দখল করে নেওয়া হয়। প্রথমে কেয়ারটেকার, পরে নিজেকে মালিক ঘোষণা। খাজনা দেয় না, কর দেয় না, অথচ সম্পত্তির একচ্ছত্র অধিকার ভোগ করে।

এরা পরের জায়গা, পরের জমিনের ওপর ঘর তুলে বসবাস করে এবং ধীরে ধীরে ভুলে যেতে চায় যে সেই ঘরের প্রকৃত মালিক তারা নয়। আশ্চর্য বাস্তবতা হলো, আমি নিয়ম মেনে খাজনা পাতি সবই দিই, অথচ শেষ পর্যন্ত আমার জমিই নিলামে চলে যায়। অন্যদিকে দখলদাররা কোনো দায় নেয় না, কোনো জবাবদিহি করে না, তবু ক্ষমতার ছায়ায় নিরাপদ থাকে।

বাংলাদেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতৃত্বই কোনো না কোনোভাবে অন্যের সম্পত্তি দখলের সঙ্গে জড়িত। এটি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা। ক্ষমতার সঙ্গে দখল জড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে দায়মুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এই দখলদার সংস্কৃতির রাজনৈতিক পরিচয় বিএনপি। এরা প্রথমে পরিবারের সদস্যদের পরাজিত করে, তাদের ঠকিয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে। সেই অভ্যাসই পরে জাতীয় পর্যায়ে লুটপাটে রূপ নেয়, সংসদে গিয়ে বৈধতার মোড়ক পরে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় এখানেই। জাতীয় খেলোয়াড় হিসেবে টিকে থাকতে হলে শুধু পরিবারের মানুষদের ঠকানো যথেষ্ট নয়। সেখানে আরও বিস্তৃত দুর্নীতির অনুশীলন দরকার, বড় পরিসরের অভিজ্ঞতা দরকার।

আমাদের কর্নেল ভাইয়ের অভিজ্ঞতা এখনো সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যেই আটকে আছে। পরিবারের ভেতরে তিনি দক্ষ খেলোয়াড় হতে পেরেছেন, বিএনপির ভালো খেলোয়াড় হিসেবেও পরিচিত। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের খেলায় নামার মতো প্রস্তুতি এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

এই অত্যাচারে পরিবারের সদস্যরা অতিষ্ঠ। এটি কেবল পারিবারিক বিরোধ নয়। এটি নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন। এই কারণেই আমি নীরব থাকিনি। আমি শেখ হাসিনার কাছে খোলা চিঠি দিয়েছি। দুদকের কাছে লিখেছি। অতীতের সেনা প্রধানকেও অবগত করেছি এই মর্মে যে অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যরা ক্ষমতা ও পরিচয় ব্যবহার করে কী ধরনের কুকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। এরপর আমি ড. ইউনূসের কাছেও অভিযোগ করেছি। সেখান থেকেও কোনো প্রতিকার পাইনি।

আজ এই পরিবারের কলঙ্ক বিএনপির লেভেল ব্যবহার করে আমাদের আওয়ামী লীগপন্থি বানিয়ে দেশের সম্পদ লুটপাট করছে। তারা হয়তো ভুলে যেতে শুরু করেছে যে আমি শেখ হাসিনাকে তার অপকর্মের কারণে সামান্যতম ছাড় দিইনি। আমি বিএনপির নেতাকর্মীদেরও ছাড় দিইনি যখন প্রশ্ন এসেছে দুর্নীতি নিয়ে। আমার অবস্থান দলভিত্তিক নয়, নৈতিক।

যদি দেশে বিচার না থাকে, তবে রাষ্ট্রের কাছে আমার শেষ প্রশ্ন এটি। আজ যদি রাষ্ট্র নিজেই তদন্ত না করে, যদি দখলদার ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই অভিযোগ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের দরজায় যাবে। এটি কোনো হুমকি নয়। এটি একজন নাগরিকের শেষ অবলম্বন।

এটাই কি আমাদের বাংলাদেশ। এই দেশের জন্য আমরা লড়াই করি, নিয়মিত কর দিই, বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরিয়ে রেমিট্যান্স পাঠাই, অথচ দেশের মালিকানা আমাদের নয়। আমরা কেবল ভাড়াটে। নিজের জমিতে নিরাপত্তা নেই, নিজের ঘরে নিশ্চয়তা নেই, নিজের দেশে নাগরিক মর্যাদাও প্রশ্নবিদ্ধ।

তাহলে বলুন, আমাদের পরিচয় কী হবে। রেমিট্যান্সযোদ্ধা, না কি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। ভোটার, না কি শুধু অর্থ পাঠানোর যন্ত্র।

সামনে আবার জাতীয় নির্বাচন। আমরা আর দুর্নীতিবাদী রাজনীতি চাই না। আমরা আর দুর্নীতিপরায়ণ পরিবারতন্ত্র, স্বৈরাচার কিংবা স্বৈরশাসনের মুখোমুখি হতে চাই না। আমরা বারবার রাজপথ রক্তাক্ত করতে চাই না। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট করে বলতে চাই, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না।

আমরা আমাদের স্বাধীনতা চাই। আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব চাই। আমরা চাই এই রাষ্ট্র তার নাগরিককে রক্ষা করুক, দখলদারকে নয়। ক্ষমতার পরিচয় দেখে নয়, অপরাধের ভিত্তিতে বিচার হোক।

রাষ্ট্র যদি এই ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, যদি রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস না দেখায়, যদি এই লেখার জবাব দেশের প্রশাসন দিতে না পারে, তাহলে একটি কথাই বলার থাকে, দয়া করে অবিলম্বে সরে দাঁড়ান।

এতকিছুর পরও পরিশেষে এতটুকু বলি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পতন ঘটেছিল। ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে। ২০২৬ সালে পতন ঘটাতে হবে চাঁদাবাজদের। তবে এই লড়াইয়ে নামতে গিয়ে আমাদেরই যেন দুর্নীতিগ্রস্ত না হতে হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ও কেউ কেউ আদর্শের আড়ালে দুর্নীতিতে জড়িয়েছিল। ২০২৪ সালেও অনেকে বাহবা পাওয়ার হিসাব কষে এমন কাজ করেছে, যার জন্য প্রশংসার বদলে জাতির কাছ থেকে ঘৃণার বাণী শুনতে হচ্ছে। ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দেয়। ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে একই ভুল বারবার ফিরে আসে। তাই এবার শিখতে হবে, যেন আমরা আর একবারও সেই পথে না হাঁটি।

কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, নাগরিক যখন শেষ আশাটুকুও হারায়, তখন সে আর কাগজে কলমে কথা বলে না। তখন সে রাজপথে ফিরে আসে। নতুন করে। আরও দৃঢ়ভাবে। এটাই সতর্কবার্তা। এটাই শেষ আহ্বান।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com

এমআরএম