একসময় গ্রামবাংলার উঠোন কিংবা ধানখেতের পাশে স্বাভাবিকভাবেই জন্মাত থানকুনি পাতা। আলাদা করে চাষের প্রয়োজন না হলেও এই ছোট্ট শাকটি জায়গা করে নিয়েছিল প্রতিদিনের খাবারের পাতে। শুধু খাদ্য নয়, লোকজ চিকিৎসা, আয়ুর্বেদ এবং চীনা ভেষজ চিকিৎসায় থানকুনি ছিল বহুল ব্যবহৃত একটি উপাদান।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইংরেজি নাম ‘গোটু কোলা’ হিসেবে পরিচিত এই ভেষজকে অনেক গবেষকই বলছেন ‘দীর্ঘজীবনের সম্ভাবনাময় উদ্ভিদ’। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন থানকুনি কোনো অলৌকিক ওষুধ নয়, বরং সচেতন ব্যবহারে উপকারী একটি ভেষজ মাত্র।
মস্তিষ্কের যত্নে থানকুনি: আধুনিক জীবনযাপনে স্মৃতিভ্রংশ, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা মানসিক ক্লান্তির অভিযোগ বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, থানকুনি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়া বা মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যায় এর ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা গেছে। স্ট্রোকের পর মানসিক পুনর্বাসনেও প্রাণীর ওপর করা গবেষণায় কিছু আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে।
আলঝেইমার্স নিয়ে গবেষকদের আগ্রহ: আলঝেইমার্স রোগে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরীক্ষাগার ও প্রাণীর ওপর চালানো কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, থানকুনি মস্তিষ্ককোষকে ক্ষতির হাত থেকে আংশিকভাবে রক্ষা করতে পারে। যদিও মানুষের ক্ষেত্রে এটিকে সরাসরি চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারযোগ্য, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা কমাতে: ব্যস্ত জীবন, অনিশ্চয়তা আর কাজের চাপ মানসিক স্বাস্থ্যে বড় প্রভাব ফেলছে। থানকুনির অন্যতম গুণ হলো স্নায়ুকে শান্ত করার ক্ষমতা। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক চাপ বা ঘুমের অভাবে সৃষ্ট উদ্বেগ কমাতে এটি সহায়ক হতে পারে। এ কারণেই লোকজ চিকিৎসায় হালকা দুশ্চিন্তা বা অস্থিরতায় থানকুনির ব্যবহার দীর্ঘদিনের।
বিষণ্নতায় সহায়ক ভূমিকা: থানকুনি মস্তিষ্কের কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হয়। সীমিত গবেষণায় দেখা গেছে, এটি বিষণ্নতার কিছু উপসর্গ যেমন মন খারাপ, অস্থিরতা বা নেতিবাচক ভাব হালকা করতে সাহায্য করতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই এটিকে ওষুধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
রক্তসঞ্চালন ও শরীরের ফোলা কমাতে: দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা বা দীর্ঘ ভ্রমণের ফলে অনেকের পা ও গোড়ালি ফুলে যায়। গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, থানকুনি শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত তরল কমাতে এবং রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক হতে পারে। ভ্যারিকোজ ভেইনের ক্ষেত্রেও এর কিছু ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
ঘুমের সমস্যায় স্বস্তি: অনিদ্রার পেছনে যদি মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা কাজ করে, তাহলে থানকুনি কিছুটা আরাম দিতে পারে। যদিও এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনো সীমিত, তবে লোকজ চিকিৎসায় ঘুমের সমস্যা কমাতে থানকুনির ব্যবহার নতুন নয়।
ত্বকের যত্নেও ভূমিকা: গর্ভাবস্থা কিংবা হঠাৎ ওজন বাড়া-কমার ফলে শরীরে যে স্ট্রেচ মার্ক পড়ে, তা কমাতে থানকুনি উপকারী হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এতে থাকা কিছু উপাদান ত্বকে কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করে। পাশাপাশি ছোটখাটো কাটাছেঁড়া বা ক্ষত দ্রুত শুকানো এবং দাগ কমাতেও থানকুনির ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
ব্যথা ও প্রদাহে উপকার: থানকুনির প্রদাহনাশক গুণ রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাত বা জয়েন্টের প্রদাহে এটি ব্যথা ও ক্ষয় কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
আরও পড়ুন: হৃদয় সুস্থ রাখতে ‘বাঁশ খান’ সুস্থ মাতৃত্বের প্রথম ধাপ, গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা যাদের মসুর ডাল এড়িয়ে চলাই ভালো লিভার ও কিডনি সুরক্ষায় সম্ভাবনাসাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় লিভার ও কিডনিতে যে বিষক্রিয়া তৈরি হয়, থানকুনি তা আংশিকভাবে কমাতে পারে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এই ফল নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা জরুরি।
থানকুনি পাতা আমাদের পরিচিত একটি ভেষজ, যার উপকারিতা নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানও নতুন করে ভাবছে। তবে এটি কোনো রোগের সরাসরি চিকিৎসা নয়। নিয়মিত বা দীর্ঘ মেয়াদে থানকুনি ব্যবহার করতে চাইলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: ওয়েবএমডি
জেএস/