আহমাদ সাব্বির
ইবনে রুশদের পূর্ণ নাম আবুল ওলিদ মোহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে মোহাম্মদ ইবনে রুশদ। তিনি ১১২৬ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোভায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিলো ফিকহ ও বিচারশাস্ত্রে খ্যাতনামা। পিতা ও পিতামহ উভয়েই কর্ডোভার কাজি (বিচারপতি) ছিলেন এবং পিতামহ একসময় সমগ্র আন্দালুসের কাজি-উল-কুজাতের (প্রধান বিচারপতি) দায়িত্ব পালন করেন।
শৈশবকাল থেকেই তিনি কর্ডোভার বিশ্ববিদ্যালয়ে কোরআন, হাদিস, ফিকহ ও কালামের পাশাপাশি চিকিৎসাবিদ্যা, অংক, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও ইতিহাসে গভীর দখল অর্জন করেন। গ্রিক ও হিব্রু ভাষাতেও তার অসামান্য পাণ্ডিত্য ছিলো। আল-কিন্দী থেকে ইবনে সিনা পর্যন্ত মুসলিম দার্শনিকদের রচনা তিনি গভীর মনোযোগে অধ্যয়ন করেন। আজীবন অধ্যবসায় ছিলো তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য—সত্তর বছর বয়সেও তিনি দিনে ষোল ঘণ্টা পাঠ ও গবেষণায় নিয়োজিত থাকতেন এবং প্রায় প্রতিটি পঠিত গ্রন্থেই নিজ হাতে মন্তব্য লিখে রাখতেন।
চল্লিশ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি একজন খ্যাতিমান দার্শনিক, চিকিৎসক ও ফকীহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। প্রথমে চিকিৎসাবিদ্যায় খ্যাতি অর্জন করলেও পরবর্তীতে দর্শন ও ফিকহর দিকে তার মনোযোগ গভীরতর হয়। ১১৬৯ সালে তিনি সেভিলের এবং ১১৭১ সালে কর্ডোভার কাজি নিযুক্ত হন। প্রায় বারো বছর তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিচারকাজ পরিচালনা করেন, যদিও বিচারকাজের অতিরিক্ত ব্যস্ততা তার গবেষণাকে কিছুটা ব্যাহত করেছিল।
ইবনে রুশদের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন মারাকেশের খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফ তাকে দরবারে আমন্ত্রণ জানান। ইবনে তোফায়েলের সুপারিশে তিনি শাহী চিকিৎসক নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে খলিফা আল-মনসুরের সময় তার সম্মান ও প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই খ্যাতিই তার জন্য বিপদের কারণ হয়। গোঁড়া আলিম ও ফকীহ সমাজ তার বিরুদ্ধে ধর্মবিরোধিতার অভিযোগ তোলে—এমনকি তাকে ‘মুনাফিক’ ও ‘কোরআন অস্বীকারকারী’ বলেও কুৎসা রটানো হয়। জনরোষ ও ধর্মীয় চাপে পড়ে খলিফা তাকে ১১৯৪ খ্রিস্টাব্দে নির্বাসনে পাঠাতে বাধ্য হন। পরে ষড়যন্ত্রের সত্যতা উপলব্ধি করে খলিফা তাকে পুনরায় মারাকেশে ফিরিয়ে আনেন, কিন্তু ততদিনে ইবনে রুশদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। ১১৯৮ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন।
ইবনে রুশদের রচনাসম্ভার বিপুল ও বহুমুখী। চিকিৎসাবিদ্যায় তার গ্রন্থসমূহ দীর্ঘদিন ইউরোপে পাঠ্য ছিলো। ভেষজবিদ্যা, রোগতত্ত্ব ও চিকিৎসা-পদ্ধতিতে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। তবে তার প্রকৃত খ্যাতি দর্শনচর্চায়। তিনি এ্যারিস্টটলের ওপর তিন স্তরের ভাষ্য রচনা করেন—সংক্ষিপ্ত (জামী), মধ্যম (তলখিস) ও বিস্তৃত (তাফসীর বা শরহ)।
ইমাম গাজ্জালির তহাফুতুল ফালাসিফাহ–এর জবাবে রচিত ‘তহাফুত আত-তহাফুত’ ইবনে রুশদের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক কীর্তি। এই গ্রন্থে তিনি যুক্তি, তর্ক ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চান যে দর্শন ও ধর্ম পরস্পরবিরোধী নয়। এই গ্রন্থই একদিকে তাকে মুসলিম সমাজে বিতর্কিত করে তোলে, অন্যদিকে ইউরোপে তাকে যুক্তিবাদের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ইউরোপে তার গ্রন্থসমূহ ল্যাটিন ও হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। ইউরোপীয় দর্শনের ইতিহাসে তিনি Averroes নামে পরিচিত এবং তার চিন্তাধারা Averroism নামে স্বতন্ত্র এক অধ্যায়ের জন্ম দেয়। মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে তিনিই পাশ্চাত্য জগতে সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী চিন্তানায়ক। পদুয়া, প্যারিস ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় Averroism-এর কেন্দ্র হয়ে ওঠে। চার্চ একাধিকবার তার দর্শনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও বাস্তবে ইউরোপীয় চিন্তা তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। রোজার বেকন থেকে টমাস আক্যুইনাস—সবাই কোনো না কোনোভাবে ইবনে রুশদের দ্বারা প্রভাবিত।
ইবনে রুশদের দর্শনের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিলো ধর্ম ও যুক্তির সম্পর্ক। তিনি মনে করতেন, কোরআনের সত্য কখনোই যুক্তিবিরোধী হতে পারে না। যেখানে বিরোধ দেখা দেয়, সেখানে মানুষের বোধশক্তির সীমাবদ্ধতাই দায়ী। তিনি কোরআনের আয়াতকে দুই স্তরে ব্যাখ্যার কথা বলেন—সাধারণ মানুষের জন্য আক্ষরিক অর্থে, আর শিক্ষিত ও চিন্তাশীলদের জন্য রূপক ও দার্শনিক অর্থে। এই অবস্থানই তাকে ধর্মতাত্ত্বিকদের চোখে সন্দেহভাজন করে তোলে।
মানববুদ্ধি সম্পর্কে তার বিখ্যাত মতবাদ হলো ‘এক ও অভিন্ন বুদ্ধি’ (Unity of Intellect)। তার মতে, বুদ্ধি সার্বজনীন ও চিরন্তন; ব্যক্তিভেদে তার গ্রহণক্ষমতার পার্থক্য ঘটে। এই মতবাদকে ইউরোপে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে মানবাত্মার একত্ববাদ হিসেবে প্রচার করা হয়, যা ইসলামী আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক চিন্তায় ইবনে রুশদ ছিলেন মানবমুক্তি ও ন্যায়বিচারের প্রবক্তা। তিনি প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের বাস্তব রূপ খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে দেখেছেন বলে মনে করতেন এবং উমাইয়া স্বেচ্ছাতন্ত্রকে সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুতি বলে সমালোচনা করেছেন। নারী সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো যুগান্তকারী—তিনি বিশ্বাস করতেন, নারী ও পুরুষ সকল ক্ষেত্রেই সমান যোগ্য এবং সুযোগ পেলে নারীরাও সমাজ, রাষ্ট্র ও জ্ঞানবিজ্ঞানে সমান অবদান রাখতে সক্ষম।
ইবনে রুশদের চিন্তা ছিলো সাহসী, নির্ভীক ও মানবমনস্তত্ত্বে গভীরভাবে প্রোথিত। তিনি ধর্মকে মানুষের নৈতিক উন্নতির সহায়ক হিসেবে দেখলেও অন্ধ বিশ্বাস ও লোকদেখানো ধার্মিকতার তীব্র সমালোচনা করেন। তার মতে, ভয় বা লোভের ওপর প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতা মানুষকে প্রকৃত উন্নতির পথে নিতে পারে না।
ইবনে রুশদ ছিলেন এমন এক মনীষী, যিনি ধর্মকে অস্বীকার না করে যুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন এবং দর্শনকে ধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহচর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। মুসলিম জগতে তিনি বিতর্কিত হলেও ইউরোপীয় রেনেসাঁর বৌদ্ধিক ভিত গড়ে দিতে তার ভূমিকা অপরিসীম। যুক্তি, স্বাধীন চিন্তা ও মানবিক মর্যাদার যে দীপ তিনি প্রজ্বালন করেছিলেন, তা আজও বিশ্বচিন্তার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে জ্বলজ্বল করছে।
ওএফএফ