‘কসাইবাড়ি রেলগেটে কমপক্ষে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এখান থেকে দক্ষিণখান বাজার পর্যন্ত পুরোটা যানজট। রিকশা এত বেশি যে মনে হয়-মানুষের চেয়ে রিকশাই বেশি। আর বৃষ্টির দিনে জলাবদ্ধতা তো রয়েছেই।’ কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা-১৮ আসনের মোল্লারটেক এলাকার বাসিন্দা জিহাদ। একই ধরনের কথা বলেন নিকুঞ্জ এলাকার বাসিন্দা পলাশ। তার ভাষায়, ‘এখানে গ্যাসের সংকট অনেক বেশি। লাইনে মাঝে মাঝেই গ্যাস থাকে না। বর্ষাকালে অনেক এলাকাই ডুবে থাকে। রয়েছে মাদকের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর পরিমাণে মাদক কারবারি বেড়েছে।’
শুধু জিহাদ ও পলাশ নয়, ঢাকা-১৮ আসনের খিলক্ষেত, উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকার সব বাসিন্দার কণ্ঠেই প্রায় একই সুর। খিলক্ষেত ও কসাইবাড়ি রেলগেট এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় রিকশার দীর্ঘ যানজট লেগে থাকে। রেললাইনের পূর্ব পাশের বেশ কিছু এলাকার রাস্তা গ্রামগঞ্জের রাস্তার চেয়েও করুণ। এ যেন আধুনিক উত্তরার পাশে নগরায়ণের সুবিধাবঞ্চিত নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার দুর্বিষহ চিত্র।
বিপরীতে উত্তরায় আভিজাত্যের ছোঁয়া। মেট্রোরেল বদলে দিয়েছে উত্তরার জীবন। আধুনিকতার প্রায় সব সুযোগ থাকা এ এলাকায়ও রয়েছে চুরি-ছিনতাইয়ে ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার চলমান থাকা রাস্তাগুলোর কাজ এখনও শেষ হয়নি। মেট্রোরেল ও আশপাশের এলাকাগুলোতে রয়েছে ধুলোবালির আধিক্য। গেল কয়েকদিন ধরে ঢাকা-১৮ আসনের বেশ কিছু এলাকা ঘুরে এমন চিত্র চোখে পড়েছে।
জানা গেছে, ঢাকা-১৮ আসনটি উত্তরা, এয়ারপোর্ট, খিলক্ষেত, উত্তরখান, দক্ষিণখান ও মোল্লারটেক নিয়ে গঠিত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১, ১৭, ৪৩, ৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৩ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড এই আসনের মধ্যে পড়েছে। এই আসনের মোট ভোটার ৬ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৩ জন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে প্রার্থী রয়েছে ১০ জন।
উত্তরা এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, মেট্রোরেল এলাকার কিছু কিছু রাস্তা ভাঙা। সব জায়গায় ধুলোর আধিক্য। খিলক্ষেত, উত্তরখান, দক্ষিণখানে রিকশার দীর্ঘ যানজট। বেশ কিছু রাস্তার কাজ চলমান রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এমনও রাস্তা দেখা গেছে, যেখানে কোনো পিচঢালাই নেই। চলাচলের উপযোগী করতে রাস্তার কোনো কোনো স্থানে বাসিন্দারাই ফেলেছেন বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ইট-বালুর টুকরো। রাস্তাগুলো এতটাই পরিত্যক্ত সেখান দিয়ে রিকশা ছাড়া অন্য কোনো গাড়ি চলাচল করে না।
উত্তরা উত্তর মেট্রো স্টেশনের নিচে কথা হয় নয়া নগর এলাকার বাসিন্দা ফারুকের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘নয়া নগরে রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা। নয়া নগর থেকে গোলগলা মোড় পর্যন্ত রাস্তা একেবারে খারাপ। রাস্তাঘাট ছাড়া সমস্যা নেই। রাতে মাঝেমধ্যে ছিনতাই হয়। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ও ছিনতাই যাতে না হয়- সেটিই আমাদের চাওয়া।’
উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথে কথা হলে ভ্যানচালক রহিম বলেন, ‘উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের পশ্চিম পাশে অনেক রাস্তা ভাঙা। অর্ধেক কাজ করে রেখে দিয়েছে। বৃষ্টি হলে খাদের মতো হয়ে যায়। ওই রাস্তায় চলাচল করা যায় না। ফুলবাড়ীয়া নামক এলাকায় মাদকের ছড়াছড়ি। উঠতি বয়সের তরুণরা সেখানে মদ খায় ও গাঁজা সেবন করে।’
এই এলাকার সোনারগাঁও জনপথে প্রায় ১৮ বছর ধরে চায়ের দোকান চালাচ্ছেন লিপি বেগম। এরই মধ্যে স্বামীও মারা গেছেন। নেই সন্তানও। এলাকার সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে লিপি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফখরুদ্দীনের আমল থেকে এখানে দোকান করছি। এই রাস্তাঘাটগুলো তখন ছিল না। এই এলাকার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আমি এই এলাকায় কোনো সমস্যা দেখি না। আমার কাছে কেউ টাকা পয়সাও চায় না।’
প্রত্যাশার বিষয়ে জানতে চাইলে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই দেশ যেন শান্তিতে থাকে। আমাদের যেন সুখ-শান্তি হয়। এলাকাকে অনেক ভালো দেখতে চাই। জনগণ চায় দেশের শান্তি। এটিই আমাদের চাওয়া।’
উত্তরার একই এলাকায় কথা হলে ৫০ বছর বয়সী স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের কোনো প্রত্যাশা নেই। যেই লাউ সেই কদু। সবই এক।’
এদিকে খিলক্ষেত, উত্তরখান ও দক্ষিণখানের রাস্তাঘাটের অনেকগুলোই ভাঙাচোরা। রাস্তাগুলোও বেশি প্রশস্ত নয়। আর রেলগেটের কারণে এলাকাগুলোতে দীর্ঘ যানজট তো রয়েছেই। এর বাইরে বেশ কিছু এলাকায় মাদকের ছড়াছড়িও রয়েছে।
খিলক্ষেতের বাসিন্দা জোনায়েত উল্লাহ রনি জাগো নিউজকে বলেন, খিলক্ষেত এলাকার প্রধান সমস্যা হচ্ছে ভেতরের ছোট রাস্তাঘাট। বড় সমস্যা হচ্ছে রাস্তাগুলো অনেক ছোট। ফলে এলাকার ভেতরে রিকশার দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। আর কোথাও রাস্তা কাটলে সিটি করপোরেশন সহজে ঠিক করে না।
প্রত্যাশার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই এলাকার ভেতরের রাস্তাগুলো ঠিক হোক। রাস্তাগুলো বড় করা হোক। আর এলাকাকে মাদকমুক্ত করা হোক।’
নিকুঞ্জ এলাকার বাসিন্দা পলাশ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের এখানে গ্যাসের সংকট সবচেয়ে বেশি। গ্যাসে আমাদের বিশাল সমস্যা। লাইনে মাঝে মাঝেই গ্যাস থাকে না। আর জলাবদ্ধতা রয়েছে। বর্ষাকালে অনেক এলাকা পানির নিচে ডুবে থাকে। এছাড়া মাদকও আছে। ইদানিং বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর পরিমাণে মাদক কারবারি বেড়েছে।
প্রত্যাশার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মাদকমুক্ত সমাজ চাই। জলাবদ্ধমুক্ত রাস্তা চাই। আর গ্যাসের ভোগান্তি দূর হওয়া অনেক জরুরি। কারণ বাসায় রান্না করতে অনেক কষ্ট হয়। বেশিরভাগ সময় হোটেলে খেতে হচ্ছে।’
ঢাকা-১৮ আসনের মোল্লারটেক এলাকার বাসিন্দা জিহাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রাস্তা। বর্ষায় পানি উঠে যায়, রাস্তা এমন খারাপ হয়ে যায় যে মনে হয় না এটা ঢাকা শহরের ভেতরের কোনো এলাকা। চলাচল খুবই কষ্টকর।’
তিনি বলেন, ‘জ্যামে কসাইবাড়ি রেলগেটে মিনিমাম এক ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। এখান থেকে দক্ষিণখান বাজার পর্যন্ত পুরোটা জ্যাম। রিকশা এত বেশি যে মানুষের চেয়ে রিকশাই বেশি মনে হয়। খিলক্ষেত দিক থেকেও বের হতে আধা ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। রেলগেটের জন্য মানুষের জীবন একদম দুর্বিষহ হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, এয়ারপোর্ট থেকে হাজী ক্যাম্প হয়ে আসার রাস্তায় কয়েক লাখ মানুষ বসবাস করেন। কিন্তু এই এলাকাটার দিকে কারও তেমন নজর নেই। বস্তি না হলেও অনেক জায়গা একদম বস্তির মতো।
এয়ারপোর্টের পূর্বপাশে রেলগেটে কথা হলে স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘গ্যাস–বিদ্যুতের অবস্থাও ভালো না। বেশিরভাগ বাসাবাড়িতেই গ্যাস নেই। আর যেগুলোতে আছে সেখানেও পানি সমস্যা খুব বেশি। অনেক সময় পানি থাকে না। বিদ্যুৎও নিয়মিত থাকে না। মাদকের কারবার এখানে ওপেন। হাজী মার্কেট, বেকারির মোড়—এই জায়গাগুলোতে সন্ধ্যার পর ইয়াং পোলাপানদের মধ্যে মাদক চলে। সবাই জানে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নেই।’
প্রত্যাশার বিষয়ে ঢাকা–১৮ আসনের মোল্লারটেকের বাসিন্দা জিহাদ বলেন, ‘ঢাকার ভেতরে সিটি করপোরেশনের এলাকা হয়েও এখানে জীবনমান অনেক নিচে। আমাদের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু না—যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হোক, রাস্তাঘাট ঠিক হোক, রেলগেটের সমস্যা সমাধান হোক। আমরা চাই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা শুধু নামেই না, বাস্তবে এসে এই এলাকার সমস্যা দেখুক। মানুষের জীবন যেন একটু সহজ হয়—এটাই আমাদের আশা।’
সরেজমিন ব্যানার ফেস্টুনের নির্বাচনি চিত্রএই আসনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দুই প্রার্থী বাদে অন্য কারো ব্যানার ফেস্টুন চোখে পড়েনি। ধানের শীষ প্রতীকের বিএনপির প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন ও হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর মো. আনোয়ার হোসেনের ব্যানার ফেস্টুন দেখা গেছে।
তবে একটি এলাকায় লাঙ্গল প্রতীকের জাতীয় পার্টির মো. জাকির হোসেনের একটি নির্বাচনি অফিস চোখে পড়েছে। সেখানে নেই কোনো চেয়ার টেবিল। বরং সাইকেলের গ্যারেজের সামনে ত্রিপল দিয়ে যে সেই অফিসটি করা হয়েছে- এক নজর তাকালেই সেটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ব্যানার ফেস্টুন চোখে না পড়লেও একই এলাকায় মাইকে করে হরিণ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ইসমাইল হোসেনের প্রচারণা চোখে পড়েছে। তবে আলোচনায় থাকায় এই আসনের শাপলা কলি প্রতীকের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) আরিফুল ইসলামের ব্যানার-ফেস্টুনও চোখে পড়েনি। অন্যদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে।
ঢাকা-১৮ আসনের প্রার্থী যারাঢাকা-১৮ আসনে প্রার্থী আছেন ১০ জন। এর মধ্যে ধানের শীষ প্রতীকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, শাপলা কলি প্রতীকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) আরিফুল ইসলাম, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর মো. আনোয়ার হোসেন, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির মো. জাকির হোসেন, রেল ইঞ্জিন প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিন হাওলাদার, মই প্রতীকে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের সৈয়দ হারুন-অর রশীদ, আম প্রতীকে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) মিসেস সামিনা জাবেদ, মোমবাতি প্রতীকে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মো. জসিম উদ্দিন, হরিণ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ইসমাইল হোসেন ও কেটলি প্রতীকে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না এই আসন থেকে নির্বাচন করছেন।
ঢাকা -১৮ আসনে ভোটারঢাকা-১৮ আসনে মোট ভোটার ৬ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫০। এই আসনে নারী ভোটার ৩ লাখ ৮২৭ জন। এই আসনে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৬ জন।
ইএইচটি/এমআইএইচএস