দেশজুড়ে

ইতালি যাওয়ার পথে মাদারীপুরের ১০ যুবক নিখোঁজ, দিশেহারা পরিবার

উন্নত জীবনের আশায় অবৈধ পথে ইতালি পাড়ি দিতে গিয়ে মাদারীপুরের ১০ যুবক গত ১০ মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। তারা বেঁচে আছেন নাকি ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারিয়েছেন, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের পরিবারের।

ভুক্তভোগীদের পরিবার জানায়, লিবিয়ায় আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পর গত বছরের এপ্রিলে ট্রলারে করে ইতালির উদ্দেশ্যে পাঠানোর কথা বলে তাদের আর কোনো খোঁজ দিচ্ছে না দালাল চক্র।

নিখোঁজরা হলেন—মাদারীপুর সদরের পেয়ারপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদ আলী (২২), মোস্তফাপুরের ওয়ালিদ হাসান অভি (১৯), কেন্দুয়া ইউনিয়নের লিমন বেপারী (১৯), রবিউল মাতুব্বর (২২), জয় মাতুব্বর (২০), জিদান হোসেন হাওলাদার (১৮) ও নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকার মাহবুব (২১)। এছাড়া রাজৈর উপজেলার শরিফুল ইসলাম (২৭), আজমুল খাঁ (৩০) ও তুহিন মজুমদার (২৩)।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, কেন্দুয়া ইউনিয়নের গাজীরচর এলাকার জাহাঙ্গীর ঢালীর স্ত্রী পেয়ারা বেগম ও তার ছেলে ফারদিন ঢালীর প্রলোভনে পড়ে এই যুবকরা ইতালির পথে রওনা হন। সরাসরি ইতালিতে পৌঁছে দেওয়ার চুক্তিতে দালাল চক্র প্রত্যেক পরিবারের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেয়। গত বছরের জানুয়ারিতে বাড়ি ছাড়ার পর তাদের লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করা হয়। সেখানে শারীরিক নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে মুক্তিপণ হিসেবে আরও কয়েক লাখ টাকা আদায় করে চক্রটি।

সবশেষে গত বছরের এপ্রিলে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লিবিয়া হয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে যুবকরা। এরপর থেকে আর কোনো সন্ধান পায়নি তাদের পরিবার। তারা বেঁচে আছেন, নাকি মরে গেছেন কিছুই জানেনা তারা।

স্থানীয়রা জানান, মানবপাচারের টাকায় পেয়ারা বেগম সম্প্রতি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন। তার বড় ছেলে ফারদিন ইতালি থেকে এই চক্র নিয়ন্ত্রণ করেন এবং ছোট ছেলে সৌরভ দেশে বসে টাকা আদায় করেন। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা দেখা দিলে অভিযুক্ত পেয়ারা বেগম ঘরবাড়িতে তালা দিয়ে সপরিবারে গা ঢাকা দিয়েছেন। এই চক্রের সঙ্গে শরীয়তপুরের সবুজ কাজী ও মুজাহিদ শেখও জড়িত বলে জানা গেছে।

নাম না প্রকাশে স্থানীয় কয়েকজন বলেন, পেয়ারা বেগম হঠাৎ করে অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। যেন আঙুল ফুলে কলা গাছের মতো অবস্থা। তাই তার ব্যাপারে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

অভিযুক্ত দালাল পেয়ারা বেগমসহ তার পরিবার গা ঢাকা দেয়ার তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

নিখোঁজ লিমনের বাবা আনোয়ার বেপারী বলেন, দালাল পেয়ারা বেগমের প্রলোভনে পড়ে আমার ছেলে ইতালী যাবার জন্য পাগল হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে তার কাছে পাসপোর্ট ও টাকা জমা দেই। ১৫ লাখ টাকায় চুক্তি করা হয়। পরবর্তীতে লিবিয়া আটকে রেখে আরও টাকা দেওয়া হয়েছে। সর্বমোট আমরা ২৮ লাখ টাকা দিয়েছি। তবুও আমার ছেলের কোনো খোঁজ নেই।

নিখোঁজ জয় মাতুব্বরের বাবা টিটু মাতুব্বর বলেন, পেয়ারা বেগমের বাড়িতে আমার ছেলের যাতায়াত ছিলো। অনেক সময় তাদের বাড়ির অনেক কাজ করে দিতেন। সেখান থেকেই লোভ দেখায়। পরে লিবিয়া নিয়ে একবার মাফিয়াদের কাছে ধরা পড়েছিল। পরে ১২ লাখ টাকা দিলে মুক্তি হয়। এরপর গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে আর কোনো খবর পাচ্ছি না। মোবাইলেও কোনো যোগাযোগ হয় না। একমাত্র পেয়ারা বেগমই জানেন আমার ছেলে কোথায় আছে।

এ ব্যাপারে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিখোঁজ ১০ যুবকের পরিবারের মধ্যে একজনের পরিবার একটি মামলা করেছেন। সেই মামলায় তিনজন গ্রেফতার আছে। এছাড়া বাকি নিখোঁজদের পরিবার থেকে লিখিত অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা সব সময়ই মানবপাচারের ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে থাকি।

আয়শা সিদ্দিকা আকাশী/কেএইচকে/এমএস