ফিচার

২৫ বছরেও অবিবাহিত, দারুচিনি গুঁড়া ছিটাবে আপনার বন্ধুরা

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সমাজে বয়স, বিবাহ বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন উপলক্ষে নানা রীতিনীতি চলে আসছে। কিন্তু ডেনমার্কে এক অভিনব রীতি দেখা যায় যখন কেউ ২৫ বছর বয়সে অবিবাহিত থাকে, তখন তার বন্ধু ও পরিবারের সদস্যরা তাকে দারুচিনির গুঁড়া দিয়ে ‘শাওয়ার’ দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। এই রীতিটি হাস্যরস ও বন্ধুত্বের এক অভিনব প্রকাশ, যা শতাধিক বছর ধরে চলমান।

এই রীতির উৎপত্তি হয়েছিল ১৬ শতকের ডেনিশ শহরগুলোতে। তখনকার সময় যুবক ও যুবতীদের মধ্যে বিবাহের গড় বয়স তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। দীর্ঘ সময় অবিবাহিত থাকার কারণে সমাজে অবিবাহিত পুরুষ এবং নারীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিলো। মূলত ছেলে মেয়েদের বিয়েতে আগ্রহী করার জন্যই এই মজার রীতি শুরু হয়।

ডেনমার্কের এই রীতিতে মূলত বন্ধুদের হাস্যরস ও আনন্দ প্রকাশক হিসেবে দারুচিনি ব্যবহার করা হয়। আধুনিক সময়ে কেউ ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত অবিবাহিত থাকলে তা মসলার রূপে বদলে যেতে পারে দারুচিনির স্থলে মরিচ ব্যবহার করা হয়, যা জ্বালার সঙ্গে মজার ইঙ্গিত বহন করে। তবে এটি কখনোই অপমানজনক নয়; বরং বন্ধুত্বের এক অভিনব দৃষ্টান্ত।

রীতিটি পালন করতে বন্ধুরা জন্মদিনের কেন্দ্রস্থলে জন্মদিন উদযাপনকারীর অবস্থান নিশ্চিত করে। অনেক সময় একটি ল্যাম্পপোস্ট বা শহরের প্রধান স্থানে তাকে সাময়িকভাবে বেঁধে রাখা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে পানি বা কাঁচা ডিম দিয়ে শরীর ভেজানো হয় যাতে দারুচিনি ভালোভাবে লেগে থাকে। তারপর মাথা থেকে পা পর্যন্ত দারুচিনির গুঁড়া ছিটানো হয়। এটি শুধু হাস্যরস নয়, একটি সুগন্ধি মসলার ‘স্নান’এর মতো অনুভূতিও যোগ করে।

অনুষ্ঠানে সবাই অংশ নেয় বন্ধু, পরিবার, কখনো কখনো শহরের অন্যান্য মানুষও। জন্মদিন উদযাপনকারীর চারপাশে হাসি, গান ও আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। অনুষ্ঠান শেষ হলেও দারুচিনির গন্ধ কয়েকদিন ধরে স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুরা থিমড পোশাক, হাস্যকর টুপি বা বিশেষ ব্যাগ নিয়ে আসে। জন্মদিনের কেকেও জন্মদিন উদযাপনকারীর নাম ও বয়স উল্লেখ করা হয়।

ডেনমার্কের তরুণ সমাজে এটি শুধু জন্মদিনের অনুষ্ঠান নয়, সামাজিক মিলনের একটি মাধ্যম। অনুষ্ঠান চলাকালীন বন্ধুরা হাসি-ঠাট্টা করে, গান গায়, নাচে এবং গল্প ভাগাভাগি করে। অনেক শহুরে যুবক এই রীতিকে আধুনিক আকারে উদযাপন করে ভিডিও শুট, ফটো সেশন, লাইভ স্ট্রিমিং ইত্যাদি।

খাবারের দিক থেকে, যদিও দারুচিনি শাওয়ার মূলত রসিকতা ও ঐতিহ্য, তবে সাধারণ কমিউনিটি সেন্টারের মতো টেবিলও সাজানো হয়। স্থানীয় কেক, চা, কফি, স্ন্যাক্স এবং মিষ্টি খাবার পরিবেশিত হয়। কিছু পরিবার মিষ্টি, পায়েস বা অন্যান্য খাবারে দারুচিনি ব্যবহার করে অনুষ্ঠানের ঐতিহ্যকে আরও স্পর্শকাতর করে তোলে।

এই জন্মদিনের পোশাক ও আনুষঙ্গিক ব্যাপারেও বেশ বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। বিয়েতে তারা সাধারণ পোশাক পরলেও অনেক সময় থিমভিত্তিক বা হাস্যকর টি-শার্ট, স্কার্ফ, বা টুপি ব্যবহার করা হয়। মেয়েরা ফ্রক বা থিম কালারের পোশাক বেছে নেন, আর ছেলেরা কাসুয়াল বা মজার টি-শার্ট পরে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। মূল লক্ষ্য হলো জন্মদিন উদযাপনকে আনন্দঘন ও স্মৃতিময় করে তোলা।

সামাজিক অর্থে, এই রীতি একটি পাবলিক প্রাঙ্ক নয়। বরং এটি একটি বন্ধুত্বপূর্ণ উদযাপন, যেখানে একজন ব্যক্তির জীবনের বিশেষ মাইলস্টোনকে হাস্যরসের মাধ্যমে সম্মান করা হয়। এটি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্কের গুরুত্ব, সমাজে মেলামেশার মূল্য এবং হাসির মাধ্যমে স্মৃতি তৈরি করার গুরুত্ব তুলে ধরে।

ডেনমার্কের দারুচিনি শাওয়ার রীতি একদিকে সামাজিক চাপ কমায়, অন্যদিকে বন্ধুত্ব ও আনন্দ উদযাপনের একটি অভিনব মাধ্যম প্রদান করে। জন্মদিন উদযাপনকারীর জীবনকে হাস্যরস ও মজার সঙ্গে স্মরণীয় করে তোলে, যেখানে বন্ধুদের অংশগ্রহণ, মসলার গন্ধ, কেক, গান, নাচ এবং থিমড পোশাক সব মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

এই রীতি ডেনমার্কের সংস্কৃতিতে একটি অনন্য উদাহরণ, যেখানে বয়স, অবিবাহিতা এবং সামাজিক অনুষ্ঠানকে হাস্যরস ও আনন্দের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়। এটি শুধু জন্মদিন উদযাপন নয়; এটি বন্ধুত্ব, সমাজ ও ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ, যা দারুচিনির গন্ধে মিলে যায়।

আরও পড়ুনযার সংগ্রহে যত তিমির দাঁত, বিয়ের পাত্র হিসেবে সে তত এগিয়েবিয়ে এত সহজ নয়, কাঠ কেটে বর-কনেকে দিতে হয় পরীক্ষা

সূত্র: দ্য নট, মিডিয়াম

কেএসকে/জেআইএম