বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সকাল ১০টা। নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়ার চেয়ারম্যান ঘাটে আলমের চা দোকানে কথা হয় দিনমজুর মোহাম্মদ আলীর (৫০) সঙ্গে। তিনি প্রথম ভোট দিয়েছেন ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ২০০১ ও ২০০৮ সালে ভোট দিতে পারলেও এরপর আর কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ হয়নি।
তিনি চায়ে চুমুক দিয়ে জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনেকদিন পর ভোট দেবো। খুব খুশি লাগছে। এখন পর্যন্ত ভোটের পরিবেশও ভালো। কিন্তু ভোটের ব্যালটে নাকি গণভোট দিতে হবে। তা কী সেটা বুঝতেছি না। সবাই বলে এটা নাকি দেশের জন্য ভালো হবে। তবে এটা কীভাবে দেবো তা কেউ বলেনি। এটা যদি ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতো ভালো হতো।’
নদী পার হওয়ার সময় স্পিডবোটে কথা হয় ব্যবসায়ী মো. সাহেদের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে শক্ত অবস্থানে ধরে রাখতে গণভোট দিতে হবে। কিন্তু এটার কোনো প্রচার-প্রচারণা নেই। সরকারি দপ্তরগুলো দায়সারা প্রচারণা চালাচ্ছে। এটা নিয়ে রাজনৈতিক দল এবং সরকার যদি ভালোভাবে প্রচার-প্রচারণা করতো, তাহলে গ্রামের সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষজন আরও বেশি করে এটা সম্পর্কে জানতো।’
একই বোটে আরেক দিনমজুর মো. শহিদ উল্যাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘দ্বীপের সাত লাখ অধিবাসীর মধ্যে ৮০-৮৫ শতাংশ মানুষ দিনমজুর, মৎস্যজীবী ও খেটে-খাওয়া। তারা দিনে এনে দিনে খাওয়া লোক। গণভোট বিষয়ে দ্বীপের ৯০ শতাংশ মানুষ কিছুই জানে না। তবে শুনেছি সরকার বাজারে বাজারে প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু আমার চোখে পড়েনি। আমরা নিজেরা গণভোট বুঝি না। বাড়ির লোকজনও কিছুই জানে না।’
হাতিয়ার নলচিরা ঘাটের মাঝি আবদুস ছোবহান বলেন, ‘গত ১৭ বছর ভোট না থাকায় এবার মানুষ ভোটে আগ্রহ আছে। কিন্তু পরিবেশ ভালো না থাকলে এবারও লোকজন কেন্দ্রে যাবে না। টেলিভিশনে দেখেছি দেশের জন্য গণভোট ভালো হবে। কিন্তু এ সম্পর্কে দ্বীপের মানুষকে আরও সচেতন করতে হবে। তা না হলে এ ব্যালট দিলেও লোকজন তার মর্ম বুঝবে না।’
ওসখালি যাওয়ার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক আবদুল গফুর বলেন, ‘হাতিয়ায় ১০ জন প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু তারা নিজেদের প্রতীক নিয়ে কথা বললেও হ্যাঁ-না ভোট নিয়ে কোনো কথা বলেন না। এটা নিয়ে আরও বেশি প্রচার-প্রচারণা দরকার।’
প্রবাসী আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশ গড়তে গণভোটের বিকল্প নেই। কিন্তু দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় এর কোনো প্রচার-প্রচারণা নেই। নারী-পুরুষের বেশিরভাগই গণভোট সম্পর্কে কিছুই জানে না। সরকারি দপ্তরগুলো কিছুটা প্রচারণা করলেও তা উপজেলা ও তার আশপাশের এলাকায়। কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠী উপকূলে বসবাস করে। তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জন্য কোনো পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়েনি।’
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা এ ভোট বুঝিও না, দিতেও পারবো না। কেউ শিখিয়ে দিলে হয়তো দিতে পারবো। আর এ ভোট দিলে কী হবে তাও জানি না।’
স্থানীয়রা জানান, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়া উপজেলা নিয়ে নোয়াখালী-৬ আসনটি গঠিত। এখানকার মানুষ চলাচলের জন্য একমাত্র নদীপথ ছাড়া কোনো উপায় নেই। ঝড়-তুফান পেরিয়ে এ দ্বীপের প্রায় সাত লাখ অধিবাসী জোয়ার-ভাটার সঙ্গে যুদ্ধ করে চলাচল করেন। দ্বীপের মানুষ অনেক মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। এখানকার প্রধান সমস্য নদীভাঙন। দ্বীপের বেশিরভাগ মানুষ দিনমজুর, মৎস্যজীবী ও খেটে-খাওয়া।
এই আসনে এবার ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরমধ্যে বিএনপি, এনসিপি ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে স্থানীয়দের অভিমত।
আসন্ন সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘আমরা শাপলা কলি প্রতীকের পাশাপাশি গণভোটে হ্যাঁ-তে ভোট দিতে জনগণেকে উদ্বুদ্ধ করছি। ইনশাআল্লাহ এখানে শাপলা কলির পাশাপাশি হ্যাঁ জয়যুক্ত হবে।’
বিএনপির প্রার্থী দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, ‘আমরা দ্বীপের মানুষের জন্য বিএনপির উন্নয়নসহ জনগণের দোরগোড়ায় ফ্যামিলি-কৃষি কার্ডের সুবিধার কথা বলে ধানের শীষে ভোট চাচ্ছি। পাশাপাশি গণভোটে অংশগ্রহণ করতেও ভোটারদেরকে আহ্বান জানাচ্ছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলা উদ্দিন বলেন, ‘গণভোটে অংশ নিতে জনগণকে সচেতন করার জন্য আমরা বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে আসছি। প্রত্যেক বিদ্যালয়ে এবং প্রতিটি দপ্তরে এর প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’
এই আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন। পুরুষ ভোটার এক লাখ ৭৮ হাজার ৩৩২ জন, নারী ভোটার এক লাখ ৬০ হাজার ৮৫২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার দুজন। এখানে মোট ভোটকেন্দ্র ১০৪টি, ভোট কক্ষ ৬৬৫টি।
নোয়াখালী-৬ আসনের ১০ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হলেন বিএনপির মোহাম্মদ মাহবুবের রহমান শামীম (ধানের শীষ), এনসিপির আবদুল হান্নান মাসউদ (শাপলা কলি), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) আমিররুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেক (একতারা), জাতীয় পার্টির এটিএম নাবী উল্যাহ (লাঙ্গল), স্বতন্ত্র তানবীর উদ্দিন রাজিব (ফুটবল), গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) মোহাম্মদ আজহার উদ্দিন (ট্রাক), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) মোহাম্মদ আবদুল মোতালেব (তারা), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মোহাম্মদ আবুল হোসেন (ছাতা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম শরীফ (হাতপাখা) এবং স্বতন্ত্র মোহাম্মদ ফজলুল আজিম (হরিণ)।
এসআর/জেআইএম