বহু ত্যাগের বিনিময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ এসেছে। কোন অবস্থাতেই এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না অন্তর্বর্তী সরকার। বিগত তিনটি বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়নি। বছরের পর বছর ভোটের অধিকার বঞ্চিত হয়েছে সাধারণ মানুষ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একটি উৎসবমুখর, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে অনড় অবস্থান নিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূসও। এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষ আস্থা রাখছেন তাঁর ওপর।
একই দিনে এবার প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। অর্থ, পেশিশক্তি ও কারসাজি যাতে এই নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে না পারে সেদিকেই মনোযোগ সবার। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) তিনবাহিনী প্রধানসহ অন্যান্যদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের ধাপে ধাপে পরীক্ষা শুরু হলো। আজ থেকে শুরু। ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ফাইনাল।’ এই নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যত তিনি ভবিষ্যতে নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি আদর্শ উদাহরণ তৈরি করতে চান।
এর ঠিক ৫ দিনের মাথায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। গত সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সেনা সদরে সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, 'আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই সংবেদনশীল সময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী অতীতের মতো এবারও পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে, এ বিষয়ে সরকার আশাবাদী।’
তামাশাপূর্ণ নির্বাচনী সংস্কৃতির দাঁড়ি টানতে প্রধান উপদেষ্টার মতোই অভিন্ন প্রত্যাশা দেশের সাধারণ মানুষ ও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর। জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেখতে চান তিন বাহিনী প্রধানও। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনও একাধিকবার নিজেদের এমন প্রতিশ্রুতির কথা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন। দেশের প্রতিটি সংকটে, দুর্যোগে-দুর্বিপাকে আলোর দিশারি হয়ে জাতিকে পথ দেখানো দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চায়।
বিভিন্ন সময়ে মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচারকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের মনোবল দৃঢ় ও অটুট রয়েছে। নির্বাচনের প্রধান দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় 'ফ্রন্টলাইনার' হিসেবে দীর্ঘ সময় পর এবার মিলছে সশস্ত্র বাহিনীকে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে নির্বাচন কমিশন ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২’ সংশোধন করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে আবারও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে দিয়ে নির্বাচন বানচালের গুজব-চক্রান্ত রুখে দেওয়ার কৌশলী চালেও সরকার ষড়যন্ত্রকারীদের কুপোকাত করেছে। সাধারণ মানুষ জানে ম্যাজিষ্ট্রেসি ক্ষমতায় ভোটে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি মানেই অপরাধী-দুর্বৃত্ত পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য। এখন পর্যন্ত সরকার এমন দুর্দান্ত একটি ইনিংস খেলেছে। যেন টুঁটি চেপে ধরেছে কল্পকাহিনীর সিরিজ রটানো মহলবিশেষকেও!
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি 'ভোটের ফাইনাল' কেমন হতে পারে এ নিয়ে নানাজনের নানা মত থাকলেও এক বাক্যে সবাই স্বীকার করেছেন নিরাপদ ভোটের পরিবেশ সৃষ্টিতে দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর অপরিহার্যের কথা। ফাইনালকে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করতে সরকার ও ইসির জন্য বড় টোটকা হতে পারে জাতির পরম আস্থা-ভালোবাসা ও ভরসার প্রতীক এই বাহিনীই। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের আগে-পরে শান্তি ও সম্প্রীতির সম্মিলনে দৃঢ়, সাহসী ও কুশলী নেতৃত্বের সমন্বয় ঘটিয়ে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন শুধু অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণই হননি; জনজীবনে স্বস্তি নিশ্চিতের মাধ্যমে অগ্রগতির মিছিলে দেশকে শামিল করতেও সক্ষম হয়েছেন। ছাত্র-জনতার হৃদস্পন্দন অনুভব করেই অন্তরাত্মার ডাকে তাঁরা সাড়া দিয়ে ক্ষমতা নয় গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিশ্ব দরবারে নতুন প্রভাতে উজ্জ্বল বাতিঘরের মতো জাজ্বল্যমান করেছেন নিজেদের বাহিনীকে। নির্বাচনের মতো একটি বহুল কাঙ্ক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরকালকে অতিক্রম করতে সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতায় নিজেদের আন্তরিকতার কথাও বহুবার পুনর্ব্যক্ত করেছেন সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশে নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়েছে। জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর। প্রতিশ্রুতি, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি কৌশলী বক্তব্য, জনসভা, জনসংযোগে মাঠ এখন সরগরম। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা সাধারণ ভোটারদের সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করছেন। তবে নির্বাচন ও গণভোটকে গ্রহণযোগ্য করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বড় একটি ফ্যাক্টর। মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে প্রার্থী ও ভোটারদের। সরকারকে নিয়ে যুক্তিপূর্ণ এই সমালোচনা সাদরেই গ্রহণ করছেন প্রধান উপদেষ্টা। ভিন্নমত তিনি সহ্য করতে পারেন বলেই কীনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক ও সুধী মহলের কথাবার্তা তাঁর নজর এড়ায়নি মোটেও।
বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনও পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়া নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন মাথায় রেখেই সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) একটি উচ্চপর্যায়ের সভা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই বৈঠক হয়। সভায় কয়েকজন উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান, পুলিশ প্রধান, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবসহ আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সংস্থাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে গণঅভ্যুত্থানকালে দেশের বিভিন্ন থানা থেকে ৩ হাজার ৬১৯টি অস্ত্র লুট হয়েছিল।
লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ২ হাজার ২৫৯টি উদ্ধার করা হয়েছে, যা লুট হওয়া অস্ত্রের ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ। সেনাবাহিনী প্রধান আরও জানান, একই সময়ে দেশের বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া গোলাবারুদের পরিমাণ ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড। ইতোমধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড উদ্ধার করা হয়েছে, যা ৫২ শতাংশ। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, নির্বাচনের সময় জনমনে স্বস্তি নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলো পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা সামনের দিনগুলোয় কার্যকর করা গেলে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেওয়া সম্ভব।
একটি বিবেকবান জাতি গঠন ও বাংলাদেশের স্বপ্নের প্রজ্বালনে শত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে, চড়াই-উতরাই ভেঙে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনমুখী সাফল্য অব্যাহত রাখতে প্রশ্নহীন বা নি:শর্ত সমর্থন দিয়ে চলেছেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। নেতৃত্বে গভীর দেশপ্রেমের নির্যাসে, রণনে-অনুরণনে তাঁরা উদ্দীপ্ত করেছেন দেশের সাধারণ মানুষকে। আলোকবর্তিকার মতো বারবার জানান দিয়েছেন নিজেদের বাহিনীর সাফল্যমণ্ডিত অস্তিত্ব।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গত ৩৮ বছরের বেশি সময় ব্লু-হেলমেটের অধীনে বিশ্বের বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ দেশে বাংলাদেশ সেনবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনী শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে দেশকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।
নিজ দেশেও সংকটময় মুহুর্তে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নি:স্বার্থ মানসিকতায় দেশ ও জনগণের পাশে থেকে দায়িত্বশীলতা, সততা ও নিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত রচনা করেছে। তাদের পক্ষেই সম্ভব অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য একটি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায়কেও সাফল্যে পরিপূর্ণ করার।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম।
এইচআর/জেআইএম