নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে বাংলাদেশ ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে চায় না। যে কারণে বাংলাদেশ আইসিসির কাছে আবেদন জানিয়েছে, ভেন্যু পরিবর্তন করে শ্রীলঙ্কায় তাদের ম্যাচগুলো আয়োজন করার জন্য। কিন্তু আইসিসি সেই আবেদন নাকচ করে দিয়েছে। সে সঙ্গে বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকেই বাদ দিয়ে দিলো।
বাংলাদেশের ভেন্যু পরিবর্তনের আবেদন নাকচ করার পর বিশ্বকাপে তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করেছে আইসিসি। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— আইসিসি কি একই ধরনের ঘটনায় দ্বিচারিতার আশ্রয় নিলো? দেশ ভেদে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল কী ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করছে?
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করে। তবে একাধিক বৈঠক, নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও আলোচনার পরও আইসিসি সেই আবেদন গ্রহণ করেনি। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করায় বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে দেয়— যা আইসিসির ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
এই সিদ্ধান্তের পরপরই আলোচনায় ফিরে আসে ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির প্রসঙ্গ। ওই সময় ভারত পাকিস্তানে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিরপেক্ষ ভেন্যু চেয়েছিল। প্রায় তিন মাস আগে থেকেই বিষয়টি জানানোয় আইসিসি শেষ পর্যন্ত ‘হাইব্রিড মডেল’ অনুমোদন করে এবং ভারত তাদের ম্যাচগুলো খেলেছিল দুবাইয়ে। সেই সিদ্ধান্ত তখনও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, বিশেষ করে ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ভারতে গিয়ে খেলার প্রেক্ষাপট যখন তৈরি হয়েছিল।
এই দুই ঘটনার তুলনা টেনে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মাহসিন নাকভি বলেন, ‘এটা দ্বি-মুখী নীতি ছাড়া আর কিছু নয়।’ তার মতে, এক ক্ষেত্রে ভেন্যু বদলের অনুমতি দেওয়া হলেও অন্য ক্ষেত্রে তা নাকচ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সের সিদ্ধান্তের পর। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হুমকির মুখে বিসিসিআইয়ের নির্দেশে ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতি’র কথা তুলে আইপিএল থেকে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেয় কেকেআর।
কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না থাকলেও এই সিদ্ধান্তকে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। বিসিবি এটিকে নিরাপত্তা ইস্যুর ইঙ্গিত হিসেবে নেয়— একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে পুরো দল কিভাবে নিরাপদ থাকবে, এমন প্রশ্ন তোলে তারা।
আইসিসি অবশ্য তাদের স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়নে ভারতে বাংলাদেশের জন্য কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য বা যাচাইযোগ্য’ হুমকি নেই বলে জানায়। ফলে বিসিবির অবস্থানকে প্রতিক্রিয়াশীল ও দুর্বল যুক্তিনির্ভর বলেই ধরে নেয় আইসিসি। তবু বাংলাদেশ তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। দেশটির যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘দাসত্বের দিন শেষ। আমরা আমাদের খেলোয়াড়দের সম্মান রক্ষা করব।’
বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই মূল পার্থক্য তৈরি হয়েছে। ভারত সময় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল এবং তাদের আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগাতে পেরেছে। বাংলাদেশের সেই সুযোগ বা শক্তি ছিল না। উপরন্তু, প্রকাশ্যে হুমকি ও কড়া অবস্থান বিসিবির পক্ষে পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে।
একদিকে ভারত ১৯ বছরের বেশি সময় ধরে পাকিস্তানে না গিয়েও আইসিসি ইভেন্টে নিজেদের শর্ত আদায় করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানালেও শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের বাইরে চলে গেল। দুই ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে, ব্যাখ্যাও ভিন্ন। কিন্তু ফলাফল এক— শুধু এক পক্ষই তাদের দাবিতে সফল হয়েছে।
এই কারণেই প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ন্যায়সংগত আচরণ কি সবার জন্য সমান? নাকি ক্ষমতা, প্রভাব আর অর্থই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে দেয়? বাংলাদেশ বিশ্বকাপে ছিল, এখন নেই। আর এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু ক্রিকেট নয়, রাজনীতি ও ক্ষমতার বাস্তবতাও যে বড় ভূমিকা রেখেছে, তা অস্বীকার করা কঠিন।
আইএইচএস/