কৃষি ও প্রকৃতি

ফসলের মাঠে পাখির সুরক্ষায় কৃষকের করণীয়

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পাখির ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষের সঙ্গে পাখির সম্পর্ক শুধু সৌন্দর্য বা গানেই সীমাবদ্ধ নয়, এ সম্পর্ক হাজার বছরের সহাবস্থানের, নির্ভরতার এবং মানবিকতার। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজ সেই সম্পর্ক ভেঙে পড়ার মুখে। নানাবিধ প্রতিকূলতা, মানুষের অবিবেচক আচরণ এবং পরিবেশ ধ্বংসের কারণে পাখির জীবন আজ গভীর সংকটে। উল্লেখযোগ্য হারে কমছে পাখির সংখ্যা। বক, পানকৌড়িসহ বহু জলচর ও স্থলচর পাখি এরই মধ্যে বিপন্ন বন্যপ্রাণীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই সংকটময় সময়ে প্রশ্ন ওঠে, পাখি রক্ষায় কৃষকের দায়িত্ব কী? উত্তর একটাই, মানবতা। মানবতাই পারে মানুষ ও পাখির হারিয়ে যেতে বসা মৈত্রীকে আবার জাগিয়ে তুলতে।

পাখি ও মানুষের মৈত্রীর নজিরগ্রামবাংলার প্রতিটি সকাল শুরু হয় পাখির ডাক দিয়ে। কৃষকের ফসলের মাঠে পাখি প্রাকৃতিক বন্ধু, ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে। শিশুদের গল্পে, কবিতায়, লোকসংগীতে পাখি আবেগের অংশ। কখনো বার্তাবাহক, কখনো শুভ লক্ষণ, আবার কখনো নিছক আনন্দের উৎস। একসময় মানুষ পাখির জন্য গাছ লাগাতো, জলাশয় সংরক্ষণ করতো, ছায়াঘেরা পরিবেশ তৈরি করতো। আজ সেই মানবিক সম্পর্কের জায়গা দখল করেছে লোভ, অবহেলা ও অসচেতনতা।

বিপন্ন পাখির জীবনবর্তমানে পাখির সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার পেছনে প্রধানত মানব সৃষ্ট কারণই দায়ী। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানুষের কর্মকাণ্ড পাখিদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফসলের মাঠে বিষ প্রয়োগফসল রক্ষার নামে নির্বিচারে কীটনাশক ও বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এসব বিষ শুধু ক্ষতিকর পোকাই নয়, উপকারী পাখিকেও হত্যা করছে। বিষাক্ত পোকা খেয়ে পাখি মারা যাচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বিষ মেশানো খাবার রেখে পাখি নিধন করা হচ্ছে।

আরও পড়ুনমাগুরায় খেজুরের গুড়ে ৫ লাখ টাকা লাভের আশা 

জলাশয়ে মরণ ফাঁদজলাশয়ে অবৈধ জাল, ফাঁদ ও বিষ প্রয়োগের ফলে পানকৌড়ি, বকসহ বহু জলচর পাখি মারা পড়ছে। মাছ ধরার নামে তৈরি এই মরণ ফাঁদে আটকে পাখির করুণ মৃত্যু আজ নিত্য ঘটনা।

খাদ্য ও বাসস্থানের তীব্র সংকটগাছ কাটা, বন উজাড়, জলাশয় ভরাট ও নগরায়নের ফলে পাখির স্বাভাবিক আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। পাখিরা পাচ্ছে না নিরাপদ বাসা বাঁধার জায়গা, পাচ্ছে না পর্যাপ্ত খাবার। ফলে তারা বাধ্য হচ্ছে এলাকা ছাড়তে কিংবা মারা যেতে।

পাখির আবাসস্থল ধ্বংসরাস্তা, শিল্পকারখানা, আবাসন প্রকল্প সবকিছুতেই প্রকৃতি উপেক্ষিত। পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের ফলে পাখির চিরচেনা আবাসস্থল তছনছ হয়ে যাচ্ছে। শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও আলোকদূষণও পাখির স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত করছে।

পাখিদের অভয়ারণ্যপাখিদের অভয়ারণ্য হলো এমন একটি নির্দিষ্ট এলাকা, যেখানে পাখিরা নিরাপদে বসবাস, প্রজনন ও খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে, মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই। এখানে শিকার, গাছ কাটা, বিষ প্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আরও পড়ুনগবাদিপশুর শীতকালীন পরিচর্যা কেমন হবে? 

কেন পাখিদের অভয়ারণ্য জরুরিবিপন্ন প্রজাতির পাখি সংরক্ষণে, প্রজনন ও বংশবিস্তার নিশ্চিত করতে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে অভয়ারণ্য জরুরি। একটি অভয়ারণ্য শুধু পাখিকেই নয়, পুরো পরিবেশ ব্যবস্থাকেই সুরক্ষা দেয়।

পাখিদের বর্তমান চ্যালেঞ্জআজ পাখিরা বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ফসলের মাঠে বিষ, জলাশয়ে মরণ ফাঁদ, খাদ্য ও বাসস্থানের সংকট, মানুষ সৃষ্ট আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, শিকার ও অবৈধ পাচার পাখিদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু আইন যথেষ্ট নয়, দরকার সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।

কৃষকের করণীয় ও সিদ্ধান্তমানবতা থেকেই শুরু হোক পাখি রক্ষা। তাই জৈব কৃষি ও সমন্বিত পোকা ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। প্রাকৃতিক জলাশয় রক্ষা ও দেশীয় গাছ লাগানো জরুরি। পাখি শিকার বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আইনের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

পাখির অভয়ারণ্য তৈরিছোট ছোট পাখি সুরক্ষায় এলাকা গড়ে তোলা সম্ভব। শিশুদের মধ্যে পাখি ও প্রকৃতি প্রেম জাগিয়ে তুলতে হবে। পাখি রক্ষা মানে শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়, এটি প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানবসভ্যতাকে বাঁচানোর লড়াই। পাখি ছাড়া প্রকৃতি যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনই মানবতাও অসম্পূর্ণ।

আরও পড়ুনশখ থেকে পাখির ব্যবসা, মাসে বিক্রি ৩ লাখ 

পাখি ও মানুষের মৈত্রী টিকে থাকবে তখনই; যখন আমরা মানবিক হবো, সচেতন হবো। মানবতাই পাখি রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। আজ সিদ্ধান্ত আমাদের, আমরা কি নীরব দর্শক হবো, নাকি পাখিদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির পক্ষে কথা বলবো?

এসইউ