জাগো জবস

ক্যাডার হতে পাকাপোক্ত প্রিপারেশন দরকার

নাভিদ তাসনিম কুষ্টিয়ার সন্তান। সেখানেই শৈশব ও বেড়ে ওঠা। কুষ্টিয়া জিলা স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেন। এরপর কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। তিনি কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করেন। এরপর প্রস্তুতি নিয়ে বিসিএস পরীক্ষায় বসেন। বিসিএসের সব ধাপ পেরিয়ে সাফল্যের দেখা পান। নাভিদ ৪৩তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন।

তার বিসিএসে পুলিশ ক্যাডার হওয়ার গল্প ও নতুনদের পরামর্শ নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম—

জাগো নিউজ: আপনার শৈশব ও বেড়ে ওঠা সম্পর্কে বলুন—নাভিদ তাসনিম: নব্বইয়ের দশকে কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার নিরিবিলি একটা গ্রামে আমার জন্ম। সেখানেই শৈশব, স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ। একমাত্র চাকরির সুবাদেই নিজ জেলা ছাড়তে হয়েছে। অত্যন্ত ইন্ট্রোভার্ট ছাত্র ছিলাম। শখ বলতে বইপড়া। পাশাপাশি একটু লেখালেখির অভ্যাস ছিল, এখনও আছে।

জাগো নিউজ: আপনার পড়াশোনা সম্পর্কে বলুন—নাভিদ তাসনিম: আমি কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০১১ সালে এসএসসি পাস করি জিপিএ ৫.০০ নিয়ে। পরে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি পাস করি ৪.৮০ জিপিএ নিয়ে। পড়াশোনায় এসএসসি পর্যন্ত ভালো মনোযোগী ছিলাম। মনোযোগহীনতা শুরু হয় পরবর্তী ধাপগুলো থেকে। রি-অ্যাডমিশনে চান্স পেয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হই। এরপর ২০১৮ সালে পাস করি ৩.১৩ সিজিপিএ নিয়ে। এখনও মাস্টার্স করা হয়নি।

জাগো নিউজ: ৪৩তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডার পেয়েছেন, অনুভূতি কেমন ছিল?নাভিদ তাসনিম: ধারণা ছিল ক্যাডার হতে আরও পাকাপোক্ত প্রিপারেশন দরকার। তাই অনেকরকম অনুভূতির ভিড়ে অবিশ্বাসের ঘোর কাটাতেই প্রায় দুই দিন সময় লেগেছিল। রেজাল্ট প্রিন্ট করে কয়েকবার অ্যাডমিট কার্ডের সাথে মেলানোর পর নিশ্চিত হই— হ্যাঁ, সত্যিই এটা ঘটেছে। তবে নিজের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ অ্যাপ্লাই করে, ধ্যান-জ্ঞান এক করে পরিশ্রম করতে পেরেছি, এটা বলবো না। নিজের টার্গেটেড টাইমফ্রেমের কিছুটা আগেই ক্যাডার পেয়েছি বলে মনে করি। তাই অনুভূতিটা অবশ্যই আবেগঘন, তবে খুব নয়।

আরও পড়ুনবিদেশে পড়তে যাওয়ার পর যেসব বিষয় জানা জরুরি 

জাগো নিউজ: বিসিএস দেবেন এমন ভাবনা মাথায় এলো কীভাবে?নাভিদ তাসনিম: অনার্স শেষে সহপাঠী এক বন্ধুর পরামর্শে বিসিএসভিত্তিক প্রিপারেশন নেওয়া শুরু করি। উদ্দেশ্য ছিল প্রথম শ্রেণির একজন সরকারি চাকরিজীবী হওয়া। অনার্সের বিষয়ে পড়াশোনায় আগ্রহ ছিল না, সেটা রিলেটেড কিছুতে চাকরি করার ইচ্ছাও ছিল না। অন্য কোনো জব রিলেটেড স্কিলও ছিল না বা ফ্যামিলির ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাকআপ। সোজা কথায় বলতে গেলে, এটাই ছিল আমার একমাত্র পথ। তাই সরকারি চাকরির প্রিপারেশনকে নিজের সর্বোচ্চ ডেডিকেশন দিয়ে আঁকড়ে ধরেছিলাম। যে অবস্থানে আছি, তা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হিসেবে। হয়তো সেটার জন্যই সফল হয়েছি।

জাগো নিউজ: বিসিএস যাত্রার গল্প শুনতে চাই—প্রস্তুতি কীভাবে নিয়েছেন?নাভিদ তাসনিম: ধরাবাঁধা সময়ভিত্তিক পড়াশোনার চেয়ে প্রতিদিনের নির্ধারিত পড়াটুকু ভালোভাবে বুঝে আয়ত্ত এবং আত্মস্থ করায় গুরুত্ব দিয়েছি। প্রিলির জন্য প্রথমেই বিগত সালের বিসিএস প্রশ্নগুলোর প্যাটার্ন থেকে গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো বাছাই করে বিষয়ভিত্তিক বই থেকে পুরোটা রিডিং পড়েছি। এরপর কয়েকবার দাগিয়ে পড়া এবং পাশাপাশি বিগত এক দশকের জব সল্যুশন সমাধান করেছিলাম। অনলাইনে ও অফলাইনে নানান ধরনের এক্সাম দিয়ে প্রতিনিয়ত নিজের প্রস্তুতি অন্যদের মাঝে তুলনা করতাম। নতুন বা আনকমন প্রশ্নগুলোর উত্তর নোট করতাম এবং জানার চর্চাটা বজায় রাখতাম। লিখিত পরীক্ষার জন্য নানান প্রকাশনীর বইপড়ার পাশাপাশি অনলাইন থেকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করে সংক্ষিপ্ত নোট আকারে পড়তাম। উত্তর লেখার ক্ষেত্রে খাতায় সৃজনশীলতা, স্পষ্টতা, ম্যাপ, ডাটাচার্টের ব্যবহার এবং যথাসাধ্য সৌন্দর্য বজায় রাখতাম। ভাইভার জন্য নিজ জেলার ইতিহাস এবং বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ, অনার্সে পঠিত বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, মুক্তিযুদ্ধ এবং পছন্দের শীর্ষ ক্যাডারদ্বয়ের সম্পর্কে পড়াশোনা করেছিলাম। পাশাপাশি ইংরেজিতে কথোপকথনে অভ্যস্ত হতে প্রতিদিন নিজের সাথে চর্চা করতাম।

জাগো নিউজ: বিসিএস জার্নিতে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল?নাভিদ তাসনিম: জীবনের অন্যতম বড় কিছু ট্র্যাজেডি ছিল সেই বছরগুলোয়, সরলভাবে জীবন বা প্রিপারেশন—কোনোটাই হয়নি। তবে জীবনে প্রতিবন্ধকতা থাকবেই, এগোতে হলে এর মধ্য দিয়েই এগোতে হবে। এই মেসেজ আত্মস্থ করেছি। তাই যাই-ই করেছি, পড়াশোনা বাদ দিইনি।

জাগো নিউজ: আড়াল থেকে কেউ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন?নাভিদ তাসনিম: অনেক মানুষের সাহায্য এবং দোয়ার মিশেলে সফলতা পেয়েছি, এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। স্মৃতি রোমন্থনে অজস্র চেহারা ভেসে আসে; সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমার মা, স্ত্রীর অবদান বিশেষত মনে পড়ে। তারা চলার পথে অকুণ্ঠ সাপোর্ট দিয়েছেন, বিশ্বাস রেখেছেন এবং আত্মত্যাগ করেছেন। তবে আমি নিজের প্রতি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ।

আরও পড়ুনউচ্চশিক্ষিত বেকারত্বে বাংলাদেশ দ্বিতীয় 

জাগো নিউজ: নতুনরা বিসিএসের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন?নাভিদ তাসনিম: সফল হতে কোনো শর্টকাট খুঁজবেন না। যদি সত্যিই এ পথে আসতে চান, পড়াশোনা নিয়ে প্রচুর পরিশ্রম করার মন-মানসিকতা রাখবেন। যখন যেটুকু পড়বেন, সেটা মন দিয়ে পড়বেন, বুঝে পড়বেন এবং জানার জন্য পড়বেন। কাউকে শেখানোর মতো দক্ষতা অর্জনের জন্য পড়বেন। নিত্যনতুন বই কেনার চেয়ে একই বই দাগিয়ে বারবার পড়া বেশি কাজে দেবে। পাশাপাশি যত বেশি সম্ভব, যেখানে যেভাবে পারেন, মডেল টেস্ট পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন এবং সেখানের শীর্ষ কয়েকজনের মাঝে অবস্থান নিতে চেষ্টা করবেন। সর্বোপরি সামগ্রিক ব্যাপারটাকে প্রত্যেক ধাপে সহজভাবে দেখবেন। আত্মবিশ্বাস রাখবেন যে, আপনার দ্বারা এটা সম্ভব, খুব কঠিন কিছু নয়। ছোট ছোট ধাপে এগোবেন, একবারে খুব বেশি দূরের ভাবনার দরকার নেই। থিঙ্ক অব জাস্ট ওয়ান ডে অ্যাট আ টাইম; জাস্ট ওয়ান স্টেপ অ্যাট আ টাইম। বিনয়ী হবেন, মানুষের দোয়া নেবেন। কেবল সমমনা চাকরিপ্রত্যাশীদের সাথেই নিজের লক্ষ্য এবং প্রস্তুতি শেয়ার করবেন। সফল হওয়ার আগপর্যন্ত, বিনা অভিযোগে নীরবে-নিভৃতে পরিশ্রম করবেন।

জাগো নিউজ: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?নাভিদ তাসনিম: একজন দক্ষ পুলিশ অফিসার হয়ে বাংলাদেশ পুলিশ এবং জনগণের কল্যাণে সাধ্যমতো অবদান রাখতে চাই। এই পদের মাধ্যমে অধীনস্থ বাহিনী এবং জনগণের জন্য অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। সে উদ্দেশ্যেই প্রতিনিয়ত শিখছি এবং এগিয়ে চলেছি।

এসইউ