এনআইডির নাম মারুফ। তবে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ তাকে মিস পূর্ণিমা নামে চেনে। তিনি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার। গত কয়েকটি ভোট দেখেছেন তিনি। কিন্তু কোনোটিতে ভোট দিতে যাননি। মূলত ভোটকেন্দ্রে হয়রানি, কটূক্তি ও আলাদা লাইনে ভোট দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তিনি ভোট দিতে যান না।
তিনি জানান, ‘ভোটকেন্দ্রে যেতে আমার অস্বস্তি লাগে। আমার বেশভূষা ও পরিচয়ের সঙ্গে এনআইডির নাম মেলে না। আলাদা কোনো লাইন বা বুথ না থাকায় পুরুষদের লাইনে দাঁড়াতে হয়। ওই সময় আমার দিকে সবাই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকায়, বাজে ধরনের মন্তব্য করে। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় আমি আর ভোট দিতে যাই না।’
তিনি বলেন, ‘আত্মসম্মানের কারণে আমার মতো অনেক তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য এখন আর কোনো ভোটকেন্দ্রে যায় না। এবারো যাবো না।’
একই কারণে মারুফের (মিস পূর্ণিমার) মতো রাজশাহীর অন্তত এক হাজার তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আর ভোটকেন্দ্রে যান না।
সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক হয়েও দীর্ঘদিন থেকে ভোটাধিকার প্রয়োগে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন রাজশাহীর তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) জনগোষ্ঠীর এ সদস্যরা। ভোটকেন্দ্রে হয়রানি, সামাজিক কটূক্তি, আলাদা ব্যবস্থাপনার অভাব এবং পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে অনেকে এখন ভোট দিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
রাজশাহীর দিনের আলো হিজড়া সংঘ থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে, রাজশাহী মহানগর ও জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় এক হাজার ২০০ জন তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য রয়েছেন (পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী)। এদের মধ্যে ভোটার রয়েছেন অন্তত এক হাজার জন। তবে এদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন সময় আয়োজিত জাতীয় এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য মতে, এ অঞ্চলের মোট সংসদীয় আসন ৩৯টি। এসব আসনের ভোটারের বিপরীতে ১৭২ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন। তবে এদের জন্য প্রতিবারের মতো এবারও আলাদা কোনো ভোটকেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়নি।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাশিয়াডাঙ্গা মহল্লার ভোটার শাবনুর (এনআইডি নাম মো. জনি হোসেন) জানান, তার কমিউনিটির অনেক সদস্য এখন আর ভোট নিয়ে উৎসাহী নন।
তিনি বলেন, ‘অনেকে এনআইডি করতে গিয়ে ভোগান্তি ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তাই অনেকে আর নতুনভাবে ভোটারই হননি। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আমরা পুরুষ না নারী কোন লাইনে দাঁড়াবো সেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ি। একা একা গিয়ে তাই ভোট দিতে সাহস পাই না।’
রাজশাহীর পবা উপজেলার লিলিহলের মোড় এলাকার ভোটার ও উদ্যোক্তা রাত্রি (এনআইডি নাম রাহাত উদ্দিন রিংকু) বলেন, গত নির্বাচনে তিনি সরাসরি বাধার মুখে পড়েছিলেন।
তার ভাষায়, ‘ভোটকেন্দ্রে গেলে আমার পোশাক ও পরিচয়ের কারণে ঢুকতে দেয়নি। সঠিক তথ্য দেয়নি কেউ কোনো লাইনে গিয়ে দাঁড়াবো, কোনো কক্ষে গিয়ে ভোট দেবো। শেষ পর্যন্ত হয়রানির শিকার হয়ে ভোট না দিয়েই বাড়ি ফিরে আসি। তাই এবার আর ভোট দিতে যেতে চাই না।’
রাজশাহী দিনের আলো হিজড়া সংঘের সভাপতি মোহনা মুহিন বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রগুলো তৃতীয় লিঙ্গবান্ধব নয়। সেখানে আলাদা লাইন এবং বুথ পাওয়া যায় না। আর নির্বাচনি দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রশিক্ষণ এবং স্পষ্ট নির্দেশনার অভাবে তারাও কোনো সহযোগিতা করেন না। হিজড়া জনগোষ্ঠীর ভোটার দেখলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এসব কারণে এ জনগোষ্ঠীর সদস্যরা কার্যত তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পিছিয়েও পড়ছে।’
তিনি দাবি করেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে তৃতীয় লিঙ্গ ভোটারদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা, নির্বাচন কর্মকর্তাদের সংবেদনশীলতা বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন কোনোভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।।
এদিকে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্টি নিয়ে কাজ করেন বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। তাদের নাগরিকতা প্রকল্পের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর নাহিদা পারভীন মনে করছেন, তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর সদস্যদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা কেবল একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও। এ ব্যাপারে সময় মতো যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এ জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়বে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে।
কারণ ২০১৮ সালে গেজেট হয়েছে। সেই অনুসারে তারা ভোটার হতে পারছেন। তবে এর আগেও যারা ভোটার হয়েছেন তাদের লিঙ্গ পরিবর্তন করতে সমস্যা হচ্ছে। ফলে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তারা সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।
সাখাওয়াত হোসেন/আরএইচ/জেআইএম