জাতীয়

সর্বাধিক প্রার্থীর আসনে আগ্রহ বেশি তিন ‘সাইফুলে’

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী থাকায় এমনিতেই আলোচনায় ঢাকার ১২ নম্বর আসনটি। তার ওপর ওই আসনে তিন প্রার্থীর নামের মিল থাকায় ভোটারদের মাঝে তা বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। নির্বাচনি প্রচারণায়ও বিষয়টি বেশ সাড়া ফেলেছে।

তেজগাঁও, হাতিরঝিল ও শেরেবাংলা নগর—এ তিনটি থানা এলাকা নিয়ে গঠিত সংসদীয় এ আসনটিতে এবার মোট প্রার্থী ১৫ জন। যা দেশের ৩০০টি আসনের মধ্যে একক কোনো আসনে প্রার্থীর হিসাবে সবচেয়ে বেশি। এই ১৫ জন প্রার্থীর মধ্যে একই নামে আছেন তিনজন। যাদের নামের প্রথম অংশ একই। তারা নিজ নিজ প্রতীকে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

ওই তিন প্রার্থীর নামের কমন অংশ ‘সাইফুল’। তাদের পুরো নাম সাইফুল আলম নীরব, সাইফুল হক ও সাইফুল আলম খান মিলন। এর মধ্যে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে সাইফুল আলম খান মিলন; ফুটবল প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব ও কোদাল প্রতীকে বিএনপি জোটের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী হয়েছেন সাইফুল হক।

তিন প্রার্থীর নামের কমন অংশ ‘সাইফুল’। পুরো নাম সাইফুল আলম নীরব, সাইফুল হক ও সাইফুল আলম খান মিলন

ভোটাররা বলছেন, ওই আসনে তিন সাইফুলই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে সাইফুল আলম নীরব ও সাইফুল হকের কারণে দ্বিধায় পড়েছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী ও ভোটাররা। তাদের কেউ কেউ জোটের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নেমেছেন। আবার অনেকে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সাবেক যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরবকে সমর্থন দিচ্ছেন। আবার বিএনপির কিছু ভোটার এখনো আছেন সিদ্ধান্তহীনতায়।

আসনটিতে কোদাল আর ফুটবলের মধ্যে বিএনপির ভোট ভাগ হওয়ার যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে তারই সুযোগ নিচ্ছেন জামায়াত প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন। ফলে স্থানীয় ভোটারদের কেউ কেউ বলছেন, এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আসনটিতে শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী।

ঢাকা-১২ আসনে প্রাথমিক মনোনয়নে সাইফুল আলম নীরবের নাম ঘোষণা করেছিল বিএনপি। তবে জোটের হিসাব-নিকাশে তাকে বাদ দিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান সাইফুল হককে আসনটি ছেড়ে দেয় দলটি।

একই আসনে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের সামনে অনশন করে দলের নিবন্ধন পাওয়া আমজনতার দলের সাধারণ সম্পাদক তারেক রহমান। তার প্রতীক প্রজাপতি

কিন্তু দলের এ সিদ্ধান্ত মেনে ভোটের মাঠ ছাড়েননি নীরব; শুরু করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার শাস্তি হিসেবে দল থেকে তাকে বহিষ্কার করে বিএনপি। যুবদলের সাবেক সভাপতি নীরব ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন।

এদিকে, ঢাকা-১২ আসনে আলোচনায় আছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের আরেক শরিক গণসংহতি আন্দোলনের নেত্রী তাসলিমা আখতার। তার নির্বাচনি প্রতীক মাথাল। আবার একই আসনে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের সামনে অনশন করে দলের নিবন্ধন পাওয়া আমজনতার দলের সাধারণ সম্পাদক তারেক রহমান। তার প্রতীক প্রজাপতি। সব মিলিয়ে এ আসনের প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে।

তেজগাঁও, হাতিরঝিল ও শেরেবাংলা নগর থানা তথা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩৫ এবং ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-১২ আসন গঠিত। এ আসনের ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার ২০ জন। মোট প্রার্থী রয়েছেন ১৫ জন; যা এবারের নির্বাচনে দেশের যেকোনো একক আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

উল্লিখিত পাঁচ প্রার্থী ছাড়াও আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসন থেকে কাস্তে প্রতীকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কল্লোল বণিক, মোমবাতি প্রতীকে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোহাম্মাদ শাহজালাল, সিংহ প্রতীকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) মোমিনুল আমিন, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান, কলম প্রতীকে জনতার দলের ফরিদ আহমেদ, আপেল প্রতীকে ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের সালমা আক্তার, ছড়ি প্রতীকে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) মুনতাসির মাহমুদ, ট্রাক প্রতীকে গণঅধিকার পরিষদের আবুল বাশার চৌধুরী এবং কাঁঠাল প্রতীকে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নাঈম হাসান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

সম্প্রতি ফার্মগেট, তেজগাঁও, মহাখালী বাস টার্মিনাল ও হাতিরঝিলের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন ঘুরে সাইফুল আলম নীরবের ব্যানার-পোস্টারই বেশি চোখে পড়েছে

ঢাকা-১২ আসনের বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, এই আসনটি বিএনপির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা সাইফুল আলম নীরব। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাকে আহ্বায়ক করে ঢাকা মহানগর উত্তরের কমিটি গঠন করে বিএনপি। কিন্তু নানান অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মাত্র আড়াই মাসের মাথায় এ কমিটি বিলুপ্ত করে সংগঠনটি।

গত ৩ নভেম্বর প্রাথমিক মনোনয়নে সাইফুল আলম নীবরকে ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপি। কিন্তু জোটগত নির্বাচনের কারণে শেষ পর্যন্ত আসনটি ছেড়ে দিতে হয় কোদাল প্রতীকের সাইফুল হককে। এরপর স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যের কারণে গত ৩০ ডিসেম্বর তাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।

সম্প্রতি ঢাকা-১২ আসনের ফার্মগেট, তেজগাঁও, মহাখালী বাস টার্মিনাল ও হাতিরঝিলের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন ঘুরে সাইফুল আলম নীরবের ব্যানার-পোস্টারই বেশি চোখে পড়েছে। অন্যদিকে জোটের প্রার্থী সাইফুল হকের ব্যানার-পোস্টার দেখা গেছে তুলনামূলক কম। এছাড়া তার ব্যানারে কোদালের পাশাপাশি ধানের শীর্ষ প্রতীকের ছবি থাকায় বিষয়টি বিভ্রান্তি তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন ভোটারদের কেউ কেউ। এসব ব্যানারে লেখা—বিএনপি জোটের প্রার্থী সাইফুল হককে কোদাল প্রতীকে ভোট দিন।

কারওয়ান বাজারের সবজি আড়তের ব্যবসায়ী কামরুল হাসান। তিনি তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়ার ভোটার এবং বিএনপির তৃণমূলের কর্মী হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি তার সঙ্গে কারওয়ান বাজারে কথা হলে কামরুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাইফুল আলম নীরব ওই সংসদীয় আসনের পরিচিত মুখ। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার বেশ সখ্য রয়েছে। কিন্তু দল তাকে বহিষ্কার করেছে। এ কারণে তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন।’

‘তারপরও দলের বড় একটি অংশ নীরবের সমর্থক। তার নির্বাচনি প্রচারণাতে সেটির প্রমাণ মিলেছে। জোটের প্রার্থী সাইফুল হকের সঙ্গেও অনেকে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিএনপির ভোট দু-ভাগ হলে আম-ছালা দুই-ই যাবে’—বলেন তিনি।

ফার্মগেটের মনিপুরীপাড়ার বাসিন্দা শিকদার ফয়সাল। ওই আসনে প্রার্থীদের প্রচারণা নিয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘ঢাকা-১২ আসনে সংসদ সদস্য পদে সাইফুলের ছড়াছড়ি। এ নিয়ে ভোটাররাও বেশ কৌতূহলী। অনেকেই বলছেন, ‘এবার ভোট সাইফুলকেই দেবো’। কিন্তু কোন সাইফুলকে দেবে সেটাই রহস্য।’

জোটের হিসাব-নিকাশে বিএনপিতে যখন বিভক্তি তখন ওই আসনটি ঘিরে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন জামায়াত নেতাকর্মীরা। তারা একক প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলনের পক্ষে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, সাইফুল আলম খান মিলন আশির দশকের শুরুতে ছাত্রশিবিরের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য। একসময় ইবনে সিনা ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালকও ছিলেন। এলাকায় তার জনপ্রিয়তাও রয়েছে।

হাতিরঝিলের মধুবাগের প্রবীণ বাসিন্দা শাহবুদ্দিন। গত ২৭ জানুয়ারি মধুবাগ মাঠের পাশের একটি দোকানে বসে চা পান করছিলেন। এসময় তার পাশে বসা ছিলেন স্থানীয় বেশ কয়েকজন।

আলাপকালে শাহবুদ্দিন বলেন, ঢাকা-১২ আসনে তিন সাইফুল নিয়ে ভোটারদের মাঝে বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তবে তাদের কে কেমন ফলাফল করে ভোটের পরই তা বোঝা যাবে।

এমএমএ/এমকেআর/জেআইএম