পুরান ঢাকা মানেই ঐতিহ্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। এখানের প্রায় সব উৎসব-অনুষ্ঠানেই নজর কাড়ে নকশা রুটি। শবে বরাতের রাত হোক বা অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান, এই রুটির স্বতন্ত্র ঘ্রাণ, নকশার কারুকাজ এবং ঐতিহ্যবাহী স্বাদ মনে করিয়ে দেয় প্রাচীন ঢাকার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ধারা। শুধু খাদ্য নয়, এটি একটি শিল্পকর্ম; যার প্রতিটি নকশায় বোনা থাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের শ্রমের গল্প।
বংশাল, নারিন্দা, লক্ষ্মীবাজার, চকবাজার, নাজিমুদ্দিন রোড, মৌলভীবাজার আর বেগমবাজারের সরু গলিগুলোতে এখন বাতাসের সাথে ভেসে আসছে ভাজা ময়দা আর ঘিয়ের ম-ম ঘ্রাণ।
স্থানীয়রা বলছেন, শবে বরাত উপলক্ষে পুরান ঢাকার এই ‘রুটি উৎসব’ কেবল একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়, এটি বংশপরম্পরায় চলে আসা এক পৈত্রিক সংস্কৃতি।
অনেকের মতে, এই বিশেষ পদ্ধতির রুটি নির্মাণের কৌশলকে ‘ভৌগোলিক নির্দেশক’ বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানানো উচিত। এতে কারিগররা উৎসাহ পাবেন এবং ঐতিহ্যটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হবে।
পুরান ঢাকার শবে বরাতের রুটির প্রধান আকর্ষণ হলো এর আকৃতি এবং নকশা। সাধারণ রুটির বাইরেও এখানে তৈরি হয় মাছ, কুমির, কচ্ছপ, ফুল এবং লতাপাতার আদলে বিশালাকার সব রুটি। কোনো কোনো রুটির ওজন ৫ কেজি থেকে শুরু করে ২০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। যেখানে মূলত ময়দার কারুকাজে লোকজ শিল্প ফুটে ওঠে।
পুরান ঢাকার রুটি প্রধানত দুই ধরনের হয়। মিষ্টি ও নোনতা। নানা নকশার রুটির মধ্যে রয়েছে শাহী রুটি। এতে প্রচুর পরিমাণে কিসমিস, পেস্তা বাদাম, চেরি ফল এবং ঘি ব্যবহার করা হয়। আছে নকশা রুটি। জাফরানি রং ব্যবহার করে এসব রুটির ওপর নাম বা সুন্দর নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়।
আছে হালুয়া-রুটি জুটি। এই রুটির সঙ্গে খাওয়ার জন্য পাওয়া যায় বুটের ডাল, গাজর, পেঁপে ও সুজির বাহারি হালুয়া।
দামের ক্ষেত্রেও আছে ভিন্নতা। নকশা আর ওজন ভেদে একেকটি রুটি ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা যায়। আবার ১০০ থেকে ২০০ টাকায় ছোট নকশার রুটিও পাওয়া যায়।
শবে বরাতকে কেন্দ্র করে চকবাজারে হালুয়া-রুটির পসরা সাজিয়েছেন দোকানিরা। বড় রুটি প্রতি কেজি ২৫০ টাকা, গাজরের হালুয়া ৫০০ টাকা ও বুটের হালুয়া ৪০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। অনেকে শবে বরাতে হালুয়া-রুটি কিনছেন মেহমানের বাড়িতে পাঠানোর জন্য।
চকবাজারের দীর্ঘ ৪০ বছরের অভিজ্ঞ কারিগর আবদুল লতিফ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এইটা আমাগো হাতের জাদু। একটা মাছ-কুমির রুটি বানাইতে দুই ঘণ্টা লাগে। আঁশ কাটা, চোখ বসানো, সবই নিখুঁত হইতে হয়। শবে বরাতের এই রাতটার জন্য আমরা সারা বছর অপেক্ষা করি।’
যদিও আধুনিকতার ভিড়ে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, তবে পুরান ঢাকার রুটির বাজার এখনো তার জৌলুস ধরে রেখেছে। তবে স্থানীয়রা মনে করেন, উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য এই রুটি কেনা কিছুটা কষ্টকর হয়ে পড়ছে।
পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা ও বাজারের চিত্র দেখা যায়। প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড়ও দেখা যায় আজ।
ব্যবসায়ীরা বলেন, শবে বরাতের অন্তত তিন দিন আগে থেকেই কারিগরদের দম ফেলার সময় থাকে না। দিন-রাত চলে রুটি সেঁকার কাজ। প্রতিটি দোকানে থরে থরে সাজানো থাকে নকশা করা রুটি। কেউ কিনুক আর না কিনুক, ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা দোকানের সামনে এলেই তাদের ভালো লাগে।
নাজিমুদ্দিন রোডের নকশা রুটি ব্যবসায়ী হাজি মেজবাহ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, এবার চাহিদা অনেক বেশি। বিশেষ করে করপোরেট অফিস আর ঢাকার বাইরের লোকজন বড় বড় মাছ আর কুমির রুটির অর্ডার দেয় বেশি। আমরা শুধু ময়দা আর চিনি দেই না। এতে থাকে খাঁটি ঘি, মাওয়া আর হরেক রকম বাদাম। মানুষ বিশ্বাস করে কেনে, এটাই আমাদের সার্থকতা।
নাজিরা বাজারের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, পুরান ঢাকায় বড় হওয়া মানেই শবে বরাতের সকালে বড় একটা মাছ রুটি হাতে করে বাসায় ফেরা। এই রুটি নিজে খাওয়ার চেয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাসায় পাঠানোতেই বেশি আনন্দ। এটা আমাদের একটা সামাজিক বন্ধন।
পুরান ঢাকার এই রুটির বাজার দেখতে এবং কিনতে দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে ভিড় জমিয়েছে। আবার অনেক দর্শনার্থী আসেন কেবল এই বিশালকার রুটিগুলোর ছবি তুলতে।
উত্তরা থেকে বন্ধুদের নিয়ে এসেছিলেন রিফাত ইসলাম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, একাধিক সময়ে গণমাধ্যমে এই রুটিগুলোর সংবাদ দেখে একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এবার সরাসরি দেখতে সবাই মিলে চলে এসেছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহমিদা হক এসেছেন তার ক্যামেরা নিয়ে এই শৈল্পিক রুটিগুলোর ডকুমেন্টেশন করতে। তার মতে, এটি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ‘ফুড আর্ট’।
শবে বরাতের সন্ধ্যায় পুরান ঢাকার পাড়ায় পাড়ায় রুটি বিলি করার ধুম পড়ে। তখন ফুটে ওঠে এক সম্প্রীতির চিত্র। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পুরান ঢাকার এই রুটি ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি আজও রয়েছে।
চকবাজারের বাসিন্দা ও কলেজশিক্ষক আশরাফ আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘যত দিন চকবাজারের গলি থাকবে, তত দিন শবে বরাতের এই রুটির ঐতিহ্য বেঁচে থাকবে মানুষের মনে।’
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক এই বিশালকার নকশা করা রুটিগুলো এখন বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। যার মধ্যে রয়েছে কারিগরের অভাব ও অনাগ্রহ, উপকরণের আকাশচুম্বী দাম আর আধুনিক বেকারি সংস্কৃতির আধিপত্য।
বংশপরম্পরায় এই কাজ শিখলেও বর্তমান প্রজন্মের সন্তানরা এই পেশায় আসতে চাইছে না। বেগমবাজারের প্রবীণ কারিগর ওস্তাদ কাশেম আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার বাপ-দাদারা এইটা শখ আর ইবাদত মনে করতেন। এখন পোলাপাইনরা আর এই কষ্টের কাজ শিখতে চায় না। সারারাত আগুনের তাপে বসে নকশা করা অনেক ধৈর্যের ব্যাপার। আমরা চলে গেলে এই নিখুঁত নকশা করার মানুষ পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।’
রুটির প্রধান উপকরণ ময়দা, ঘি, চিনি এবং বাদামের দাম গত কয়েক বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে রুটির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
লক্ষ্মীবাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী সালামত মিয়া বলেন, ‘আগে মধ্যবিত্তরা অনায়াসেই বড় মাছ রুটি নিতে পারতেন। এখন ছোট সাইজের একটা রুটির দামই ৫০০ টাকার উপরে। দাম বাড়লে বিক্রি কমে, আর বিক্রি কমলে আমাদের লাভ থাকে না। ফলে কারিগররা এখন আর ঝুঁকি নিয়ে বেশি রুটি বানাতে চায় না।’
আবার পাড়ার মোড়ে মোড়ে গড়ে ওঠা আধুনিক বেকারিগুলো এখন শবে বরাতের রুটি বানাচ্ছে মেশিন ব্যবহার করে। ফলে হাতে তৈরি রুটির সেই আদি স্বাদ এবং মাটির তন্দুরের ঘ্রাণ হারিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ ছাঁচে তৈরি রুটির কাছে হাতে করা 'ফুড আর্ট' মার খাচ্ছে।
আরও পড়ুন: শবে বরাতে হালুয়া খাওয়ার রীতি কি ধর্মীয়? জানুন ইতিহাস শবে বরাতের বিশেষ আয়োজনে রাখুন পাকা পেঁপের হালুয়াসংকট থাকলেও এই ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার দারুণ কিছু সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে পর্যটন ও সাংস্কৃতিক ব্র্যান্ডিং, অনলাইন বিপণন ও ই-কমার্স অন্তর্ভু্ক্ত করা, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) অর্জন, কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
বংশালের বাসিন্দা ট্যুরিজম অপারেটর তানভীর আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, পুরান ঢাকার এই রুটি উৎসবকে কেন্দ্র করে 'ফুড ট্যুরিজম' বা খাদ্য পর্যটন গড়ে তোলার বড় সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘শবে বরাতের এই রুটি মেলা সারা বিশ্বে ইউনিক। আমরা যদি এই সময়টাকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরতে পারি এবং বড় বড় রুটিগুলোর একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে পারি, তবে এটি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত হবে।’
পুরান ঢাকার বাইরে উত্তর ঢাকা বা অন্য জেলার মানুষের মধ্যে এই রুটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বেশ কিছু তরুণ উদ্যোক্তা অনলাইনে এই রুটির অর্ডার নিচ্ছেন।
ই-কমার্স উদ্যোক্তা নাহিদ হাসান। তিনি মূলত ফেসবুকের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে রুটি তথ্য উপস্থাপন করে থাকেন। নাহিদ হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা যখন বড় কুমির রুটি বা ২০ কেজির মাছ রুটি ঢাকার বাইরে পাঠাই, মানুষের উচ্ছ্বাস দেখে অবাক হই। আধুনিক বিপণন ব্যবস্থায় এই ঐতিহ্যবাহী খাবারকে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব।’
আর পুরান ঢাকার এই আদি কারিগরদের যদি বিশেষ সম্মাননা বা প্রশিক্ষণ কর্মশালার আওতায় আনা যায় তবে তারা নতুনদের এই কাজে উৎসাহিত করতে পারবেন। হস্তশিল্পের মতো এটিকেও একটি বিশেষ কুটির শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা যেতে পারে।
স্থানীয়রা বলছেন, পুরান ঢাকার শবে বরাতের রুটি আমাদের লোকজ সংস্কৃতির এক অনন্য অংশ। এই রুটি বানানোর কারিগররা মূলত শিল্পী। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্পকে পর্যটন আকর্ষণে রূপান্তর করা সম্ভব।
এমডিএএ/জেএস/এমএমএআর