প্রবাস

দালালমুক্ত হচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, শ্রমিকের সাক্ষাৎকার নেবে এআই

বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে দীর্ঘদিনের দালালনির্ভরতা ভাঙতে নতুন যুগে পা রাখতে যাচ্ছে মালয়েশিয়া। তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যস্বত্বভোগী বাদ দিয়ে সরাসরি বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর পথে এগোচ্ছে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি আর. রামানন।

তিনি জানান, প্রস্তাবিত এই নিয়োগ পদ্ধতিটি এখনো চূড়ান্তকরণের পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষে এটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে তৃতীয় পক্ষের জড়িত থাকা মালয়েশিয়ায় একটি পুরোনো ও বহুল আলোচিত সমস্যা। সংসদ সদস্যদের প্রশ্ন থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে এই দালালচক্র শ্রমিকদের অতিরিক্ত ফি, ঋণদাসত্ব ও আধুনিক দাসপ্রথার মতো শোষণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তারা সরাসরি বিদেশি শ্রমিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। বর্তমানে নিয়োগকর্তাকে আগে এজেন্টের সঙ্গে কথা বলতে হয়। ফলে আমরা নিশ্চিত হতে পারি না, শ্রমিক সত্যিই চাকরির শর্তে সম্মত কিনা। এ কারণেই অনেকে বলেন, চাকরি ‘এ’ বলা হলেও এখানে এসে চাকরি ‘বি’ করতে বাধ্য করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার জাতীয় দৈনিক দ্য স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন রামানন এ কথা বলেন।

এই নতুন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অস্বাভাবিক ‘এজেন্ট ফি’ বন্ধ করা। মন্ত্রী জানান, অনেক শ্রমিককে মালয়েশিয়ায় আসার আগেই ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ১৯ হাজার থেকে ৩১ হাজার রিঙ্গিত) পর্যন্ত দিতে হয়। যা মানবপাচার, সামাজিক সমস্যা ও অর্থপাচারের ঝুঁকি বাড়ায়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর নীতিমালা অনুযায়ী, বিদেশি ও গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়োগ ফি এক মাসের মজুরির বেশি হওয়া উচিত নয়। অথচ বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কাজ পেতে ১৬ হাজার থেকে ২৫ হাজার রিঙ্গিত, আর নেপালি নিরাপত্তারক্ষীদের ক্ষেত্রে ১০ হাজার রিঙ্গিত পর্যন্ত দিতে বাধ্য করা হয়।

নতুন ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তার চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত শ্রমিক মিলিয়ে দেওয়া হবে। পছন্দ হলে এক ক্লিকেই ভার্চুয়াল ইন্টারভিউ নেওয়া যাবে। ভাষাগত সমস্যা দূর করতে এতে যুক্ত করা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যা তাৎক্ষণিক অনুবাদ সুবিধা দেবে।

নেপালের কোনো শ্রমিক হয়তো বাহাসা মালয়েশিয়ায় পারদর্শী নন। নিয়োগকর্তা বাহাসায় কথা বলবেন, এআই সেটি শ্রমিকের মাতৃভাষায় অনুবাদ করে দেবে বলেন মন্ত্রী।

তিনি আরও জানান, উদ্যোগটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। শ্রমিক প্রেরণকারী দেশগুলোর আইন ও নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে উচ্চ ব্যবহার সামলাতে টেকসই ও নিরাপদ প্রযুক্তি কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের লক্ষ্য, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ২০২৮ সালের মধ্যে মালয়েশিয়াকে আসিয়ান অঞ্চলের একটি নৈতিক (Ethical) নিয়োগ হাবে পরিণত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাফিকিং ইন পারসনস (TIP) রিপোর্টে টিয়ার-১ অবস্থান আরও শক্তিশালী করা।

জানা গেছে, এই ব্যবস্থা হবে সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) ভিত্তিক, যেখানে কোনো তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা থাকবে না। পাশাপাশি মাই ডিজিটাল ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিকের পরিচয় যাচাই, বেতন প্রদানসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও সহজ করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে স্বচ্ছতা বাড়বে, খরচ কমবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে শ্রমিক শোষণ রোধে একটি বড় অগ্রগতি হবে।

এমআরএম/এমএস