দেশজুড়ে

প্রার্থী চেনেন না ভোটাররা, তাপবিহীন নির্বাচনি মাঠ

ঢাকা জেলার সবশেষ উত্তরের উপজেলা ধামরাই। যা সংসদীয় ঢাকা-২০ আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চলছে প্রচার প্রচারণা। বিএনপি, এনসিপি ছাড়াও সংসদ সদস্য হওয়ার দৌড়ে আছেন জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির প্রার্থী। কাগজে কলমে ছয়জন প্রার্থী থাকলেও নির্বাচনি মাঠে তোড়জোড় নেই অধিকাংশ প্রার্থীর। প্রচারণায় বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এনসিপি রয়েছে তার পরের অবস্থানে।

উপজেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-২০ সংসদীয় ১৯৩ নম্বর আসনটি ১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। যেখানে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৭৬ হাজার ৬৩৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৩৫ ও নারী ভোটার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮০২ জন। বাকি দুজন তৃতীয় লিঙ্গের।

নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা হলেন- মো. তমিজ উদ্দিন (বিএনপি), নাবিলা তাসনিদ (এনসিপি), আহছান খান (জাতীয় পার্টি), আশরাফ আলী (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস), আরজু মিয়া (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল), হেলাল উদ্দিন আহাম্মেদ (আমার বাংলাদেশ পার্টি)।

উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে বের হতেই কথা হয় আক্কাস আলীসহ ৩-৪ জন স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে। তাদের কাছে জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম নামের একজন বলেন, পোস্টার বিহীন নির্বাচন, ২-১ একজন প্রার্থী ছাড়া বাকিদের দেখা নেই। তবে এতটুকু জানি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হবে না এবারের নির্বাচনে। যিনি পাস করবেন তিনি বিপুল ভোটে এগিয়ে থাকবেন।

প্রার্থীকে না চিনে কীভাবে যোগ্যতা বিচার করবেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রার্থী না, যোগ্যতা বিচার করবো মার্কায়।

বিএনপির ফেস্টুন আর ব্যানার দেখা গেছে ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায়। কয়েক এলাকায় এনসিপি আর জাতীয় পার্টির প্রার্থীর ব্যানারও চোখে পড়েছে। তবে বাকি প্রার্থীদের উল্লেখযোগ্য হারে তেমন ফেস্টুন-ব্যানার চোখে পড়েনি।

পঞ্চাশোর্ধ্ব হাসেম আলীর সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। তিনি বলেন, যুবক বয়সে নির্বাচনি যে আমেজ দেখেছি, তা স্বপ্ন। এখন দলের নমিনেশন নিতে যে পরিমাণ হাঁকডাক থাকে, নমিনেশন পেলে জেতার জন্য প্রার্থীদের তেমন আওয়াজ থাকে না। তারা দলের হাইকান্ডের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তবুও আমরা চাই একজন ভালো মানুষ জয়ী হয়ে আসুক।

ধামরাই সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী শাকিল শেখ বলেন, কৃষিনির্ভর ধামরাই নানা সমস্যায় জর্জরিত। মাদক, ফসলি জমি নষ্ট, চাঁদাবাজি, পরিবেশ দূষণ প্রধান সমস্যা। এছাড়াও কৃষি সেচের সমস্যাতো রয়েছেই। যারা এসব নিয়ে ভাববেন তাদেরকেই ভোটাররা গ্রহণ করবেন।

নির্বাচনি অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, প্রথম থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত ঢাকার ধামরাই উপজেলা ছিল ঢাকা-১৩ আসনের অন্তর্ভুক্ত। সেই সময় ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের তাজউদ্দীন আহমদ, ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দেওয়ান মোহাম্মদ ইদ্রিস, ১৯৮৬ সালে তৃতীয় ও ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির খান মোহাম্মদ ইসরাফিল, ১৯৯১ সালের পঞ্চম ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ, ১৯৯৬ সালের সপ্তম ও ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা তিনবার বিজয়ী হন বিএনপির ব্যারিস্টার মো. জিয়াউর রহমান খান।

২০০৮ সালে আসন বিন্যাসের পর ধামরাই হয় ঢাকা-২০ আসন। সেই বছর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের বেনজীর আহমদ। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের এম এ মালেক। এরপর ২০১৯ সালের একাদশ ও ২০২৪ এর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের বেনজীর আহমদ।

হারানো আসন কি ফিরিয়ে আনতে পারবে বিএনপি? এমন প্রশ্ন ছিল বিএনপির প্রার্থী মো. তমিজ উদ্দিনের কাছে। তিনি বলেন, বিএনপি গণরায়কে শ্রদ্ধা করে। জনগণ বিএনপির পক্ষে সবসময়ই ছিল, এখনো আছে। আওয়ামী লীগ কখনোই জনতার রায়কে মেনে নেয়নি, তারা জোর করে রায় ছিনিয়ে নিয়েছে। ধামরাইয়ে বিএনপির একটা বিশাল ভোটব্যাংক আছে। আমরা আশা করি, ধামরাইয়ের জনগণ বিএনপির পক্ষে সর্বোচ্চ ভোট দেবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ বলেন, বাংলাদেশের এখন নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হচ্ছে, যার কর্ণধার জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। সেই ধারাবাহিকতায় ধামরাই উপজেলার প্রত্যেকটি গ্রামে-গঞ্জে, হাট বাজারে ঘুরে দেখেছি মানুষ কতটা এনসিপিকে ভালবাসে। বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলছি, তারা চায় নতুনত্ব। ধামরাইয়ে সকল সমস্যা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেগুলো সমাধানই আমার কমিটমেন্ট।

আমার বাংলাদেশ পার্টি-এবি পার্টির লেফটেন্যান্ট কর্নেল হেলাল উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, এবি পার্টির প্রচার গত ৪-৫ মাস ধরেই চলছে। প্রচুর সাড়া পাচ্ছি। আমরা প্রতিদিনই প্রচার করি। মানুষ এখন তৃতীয় একটা পথ খোঁজার জন্য অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে আছে। জনগণের কাছে যখন যাচ্ছি, নতুন নতুন মানুষ যোগ দিচ্ছেন। ধামরাই থেকে ব্যাপক একটা সাড়া আশা করছি।

এদিকে নিরুত্তাপ প্রচার প্রচারণায় হলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-২০ আসনে মোট ১৩টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন ধামরাই উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. এস এম সাদিকুর রহমান এ তথ্য জানান।

উপজেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-২০ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১৪৭টি। যার মধ্যে ১৩টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ধামরাই উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. এস এম সাদিকুর রহমান জানান, অতীতে ভোট কেন্দ্রগুলোতে রাজনৈতিক সহিংসতা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের অবস্থান, ভোটকেন্দ্র দখল বিবেচনায় নিয়ে ১৩টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

মাহফুজুর রহমান নিপু/এফএ/এএসএম