ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপি। গত ১৭ বছর আওয়ামী দুঃশাসনকালে হামলা, মামলা ও নির্যাতিত হয়েও ঐক্যবদ্ধ ছিল বিএনপি। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সেই বিএনপি এখন বিভক্ত।
দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে গিয়ে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণা অংশ নেওয়ায় একের পর এক বিএনপি নেতাকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। প্রতিবাদে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরাও গণপদত্যাগ শুরু করেন। এখন পর্যন্ত মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ১৭ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে দল এবং গণপদত্যাগ করেছেন ১২২ জন নেতাকর্মী।
এই অবস্থায় বহিষ্কার ও গণপদত্যাগে এরই মধ্যে জেলা, উপজেলা, পৌর শাখা ও একাধিক ইউনিয়নের বিএনপির কমিটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, প্রতীক বরাদ্দের দিন বিদ্রোহী প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনকে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব পদসহ সকল পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর থেকে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির ৫৯ সদস্যদের মধ্যে ৮ সদস্য ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের ৯ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া জেলা আহ্বায়ক কমিটির ৫ সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেছেন। ফলে ৫৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিবসহ ১৩ সদস্যের পদ শূন্য হয়ে পড়েছে।
অপরদিকে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান সিনহা অসুস্থ হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন। ফলে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব পদে কেউ দায়িত্বে না থাকায় এখন অভিভাবকশূন্য বিএনপি। এর মধ্যে একদিকে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের কঠোর সিদ্ধান্তে বহিষ্কার অব্যাহত রাখা এবং প্রতিবাদে জেলা ও দুই উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীর গণপদত্যাগ জারি থাকায় জেলা আহ্বায়ক কমিটি, মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলা ও গজারিয়া উপজেলা বিএনপির কমিটি কার্যত ভেঙে পড়েছে। এই অবস্থায় সংকটে পড়েছে মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপি। যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে মুন্সিগঞ্জ সদর ও গজারিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত মুন্সিগঞ্জ-৩ নির্বাচনি এলাকায়।
বিএনপি নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, চব্বিশের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর চাঙা হয়ে ওঠে বিএনপির সকল ইউনিট। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সরকার গঠনের লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে নেতাকর্মীরা মাঠ পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করে তোলেন। দীর্ঘ প্রত্যাশার পর বর্তমান সরকার নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে তপশিল ঘোষণা করে। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ নির্যাতিত ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের ঘোষণা দিলেও মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে মো. মহিউদ্দিনকে বঞ্চিত করে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজকল্যাণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতনকে।
দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই ঐক্যবদ্ধ বিএনপি বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বিভক্তি মেটানোর কোনো চেষ্টা করেনি কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড। ফলে বিভক্তি আরও জটিল রূপ ধারণ করে। ফলশ্রুতিতে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মহিউদ্দিন বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠে নেমে পড়েন। এতে সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয় জেলা বিএনপির সদস্য সচিবকে।
নেতাকর্মীরা আরও জানান, বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোটের সমীকরণে দুর্বল করতে এবং দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একের পর এক বিভিন্ন ইউনিটে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতাকর্মীদের বহিষ্কার করা হয়। এই অবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে। কেন্দ্রীয় নেতাদের এমন আচরণে বহিষ্কার হওয়ার ভয়ের পরিবর্তে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতাকর্মীরা গণপদত্যাগ শুরু করেন। এরই অংশ হিসেবে জেলা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন ইউনিটের ১২২ জন নেতাকর্মী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। আরও নেতাকর্মী গণপদত্যাগ করতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন বলে দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানিয়েছেন।
এদিকে সাংগঠনিকভাবে এ পদত্যাগের কোনো ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছেন বিএনপির একাধিক নেতা। তাদের ভাষ্য, পদত্যাগ করা নেতাকর্মীরা সদ্য বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের অনুসারী।
স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কাজী আবু সুফিয়ান বিপ্লব বলেন, নির্বাচনি এলাকার ৭৮ জন ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে ৭৪ জন দলীয় প্রার্থী হিসেবে সদ্য বহিষ্কৃত মো. মহিউদ্দিনের পক্ষে মতামত দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু নেতৃবৃন্দ তৃণমূল নেতাকর্মীদের পছন্দের প্রার্থীকে বঞ্চিত করে কেন্দ্রীয় কমিটি সমাজকল্যাণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতনকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে। এর প্রতিবাদে নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিনের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এজন্য কেন্দ্রীয় কমিটি একের পর এক যেভাবে ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাদের বহিষ্কার করছে, তা সংগঠনের গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক পন্থায়।
সদ্য বহিষ্কৃত সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ফকির বলেন, দলীয় প্রার্থীর প্ররোচনায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত পত্রে বহিষ্কারের যে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে তাতে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুমতি নেই বলে কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এক নেতা আমাদের জানিয়েছেন।
অপরদিকে বহিষ্কার প্রসঙ্গে জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান জামাল বলেন, মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মহিউদ্দিন দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হলে দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। নিয়ম হলো- যে যে সংগঠন থেকে পদত্যাগ করবেন, তিনি সেই সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে লিখিতভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। কিন্তু তাদের পদত্যাগের সাংগঠনিক কোনো ভিত্তি নেই।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম মাসুম বলেন, তারা দলের তেমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ নন। বহিষ্কার আতঙ্কে তারা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু এসব পদত্যাগের সাংগঠনিক ভিত্তি নেই এবং পদত্যাগকারীরা বিদ্রোহী প্রার্থীর পকেট কমিটির লোকজন।
একদিকে স্বেচ্ছায় গণপদত্যাগ কর্মসূচি, অন্যদিকে ভোটের মাঠে বৃদ্ধি পাচ্ছে উত্তেজনা। এমন পরিস্থিতিতে ভোটের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে শঙ্কিত স্থানীয় ভোটাররা।
শুভ ঘোষ/এফএ/এমএস