প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই মেহেরপুরের ভোটের মাঠ এখন সরগরম। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থীরা ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। উঠান বৈঠক, পথসভা, গণসংযোগ- সব মিলিয়ে জেলার রাজনৈতিক আবহাওয়া বেশ উত্তপ্ত। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি আর পরিবর্তনের আহ্বানে মুখর চারপাশ। তবে এই উচ্ছ্বাসের আড়ালেই ক্রমশ বাড়ছে এক ধরনের শঙ্কা- সীমান্ত পেরিয়ে অস্ত্র প্রবেশের অভিযোগ ঘিরে উদ্বেগে প্রার্থীরা, উৎকণ্ঠায় সাধারণ ভোটাররা।
সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় মেহেরপুর বরাবরই নিরাপত্তা ইস্যুতে স্পর্শকাতর। সরকারি হিসাবে জেলার ১১৭ কিলোমিটার সীমান্ত পুরোপুরি কাঁটাতারের বেড়ায় বেষ্টিত। তবুও অভিযোগ উঠছে, বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে জেলায়। এসব অস্ত্র নির্বাচনের সময় ব্যবহার হতে পারে- এমন আশঙ্কা করছেন প্রার্থীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক উদ্ধার অভিযানের তথ্যও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মেহেরপুর জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২টি অস্ত্র, ৫৭ রাউন্ড গুলি, ৬টি কার্তুজ ও ৮টি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধার হয়েছে বেশ কিছু দেশীয় অস্ত্র। এসব পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে, সীমান্ত এলাকা দিয়ে অস্ত্র প্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, যার একটি অংশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে।
ভোটের মাঠে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরাও একই সুরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মেহেরপুর-১ আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মাসুদ অরুন বলেন, সীমান্তের ওপারে অবস্থানরত কিছু গোষ্ঠী অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে।
তিনি মনে করেন, নির্বাচন ঘিরে এসব অস্ত্র যেন ব্যবহার না হয় সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
একই আসনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী ও জেলা আমীর তাজউদ্দিন খান বলেন, ভোটারদের মধ্যে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ আতঙ্ক তৈরি করছে। প্রশাসনকে আরও কঠোরভাবে অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি।
সিপিবি প্রার্থী আইনজীবী মিজানুর রহমানের মতে, গোয়েন্দা সংস্থার কাছে থাকা সম্ভাব্য অস্ত্রধারীদের তালিকা যাচাই করে আগাম ব্যবস্থা না নিলে নির্বাচনে বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
মেহেরপুর-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আমজাদ হোসেন বলেন, একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি মনে করেন, অস্ত্র উদ্ধার হলে জনজীবনও স্বাভাবিক থাকবে এবং ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসতে পারবেন।
একই আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী নাজমুল হুদা অভিযোগ করে বলেন, অতীতে কাজিপুর সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র এসেছে, এখনও আসছে। এসব অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এদিকে দেশের বিভিন্ন জেলার থানা লুটের অস্ত্রগুলো কতটা উদ্ধার হয়েছে- তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে ভোটারদের মধ্যে।
অনেকে বলছেন, এসব অস্ত্রের অবস্থান স্পষ্ট না হলে নির্বাচনি পরিবেশ পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক হবে না। সীমান্ত এলাকা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি এই ইস্যুও ভোটারদের আলোচনায় উঠে এসেছে।
সাধারণ ভোটারদের আশঙ্কা, নির্বাচনের দিনে যদি অস্ত্রের মহড়া দেখা যায় বা সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়, তবে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কমে যেতে পারে। এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই আগাম কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মেহেরপুর পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায় বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং নির্বাচনের আগে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলারোধে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে।
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা ড. সৈয়দ এনামুল কবির জানান, সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনোভাবেই অস্ত্র প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য বিজিবি, সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে বিশেষ নজরদারি চলছে। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আসিফ ইকবাল/এনএইচআর/এএসএম