আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশের নির্বাচন কী প্রভাব ফেলবে ভারত-নেপালে?

দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২৬ সালের নির্বাচন মৌসুমে যদি কোনো একক ভোটকে কেন্দ্রবিন্দু ধরা হয়, তবে সেটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ঢাকায় নির্বাচনি প্রচারণা যত তীব্র হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—এই ভোটের ফল শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সরাসরি ফল নির্ধারণ না করলেও, এর প্রভাব পড়বে এ অঞ্চলের পরবর্তী তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের রাজনৈতিক আবহে—নেপালের সাধারণ নির্বাচন (৫ মার্চ) এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন (মার্চ থেকে মে)।

বাংলাদেশই আগে ভোটে যাচ্ছে। আর এমন এক অঞ্চলে, যেখানে রাজনৈতিক বয়ান ও আখ্যান ক্রমশ নির্বাচনী ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে, সেখানে আগে ভোট হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।

এই নির্বাচন আঞ্চলিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ আরও একটি কারণে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। সে সময় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে জেন জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের যে ঢেউ উঠেছিল, বাংলাদেশ ছিল তার অন্যতম কেন্দ্র। একই সঙ্গে নির্বাচনটি হচ্ছে তীব্র সামাজিক মেরুকরণ, বাড়তে থাকা ধর্মীয় কট্টরপন্থা এবং দুর্বল অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে। এর প্রভাব বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো অঞ্চলে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন>>জেন জির হাতে স্বৈরাচার পতন: নির্বাচনের দৌড়ে এগিয়ে পুরোনো শক্তিরাইবাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরানোর নির্বাচন, কার হাতে ভবিষ্যৎ?তারেক রহমানকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদনআল-জাজিরার প্রতিবেদন/ ড. ইউনূসকে কীভাবে মনে রাখবে বাংলাদেশ?

এই বাস্তবতায় প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পথের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জয় হলে তা বড় ধরনের রাজনৈতিক সংস্কারের চেয়ে বরং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় আধিপত্য টিকে থাকার প্রমাণ হিসেবেই দেখা হবে। জামায়াতে ইসলামীর ভালো ফল অর্থনৈতিক ক্ষোভের পটভূমিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নির্বাচনি গুরুত্ব বাড়ার বার্তা দেবে, যা অঞ্চলজুড়ে ইসলামপন্থি রাজনীতির স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগ জোরদার করতে পারে। আর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শক্ত অবস্থান ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হবে, যেখানে রাজপথের প্রতিবাদ ধীরে ধীরে নির্বাচনী শক্তিতে রূপ নিচ্ছে।

ফলে এই নির্বাচন কীভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার ভারসাম্য কোথায় দাঁড়ায়, তা দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, ভোটারদের সক্রিয়তা এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।

নেপালের জন্য সতর্কবার্তা

বাংলাদেশ ও নেপাল—দুই দেশেই শক্তিশালী তরুণ নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দেখা গেলেও উভয়ের বর্তমান বাস্তবতা মুখোমুখি হচ্ছে গভীরভাবে প্রোথিত রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে। পুরোনো পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতির ছায়া এখনো প্রবল। দুই দেশেই অনানুষ্ঠানিক নির্বাচনী ব্যয়ের উচ্চমাত্রা এবং প্রতিষ্ঠিত দলীয় অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণ মিলিয়ে প্রতিযোগিতার মাঠ একতরফা করে রেখেছে। নেপালে সরকারি সীমা কম থাকলেও প্রার্থীরা প্রায় দুই কোটি নেপালি রুপি পর্যন্ত ব্যয় করেন, সেখানে বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই আইনি সীমার ১২ গুণ পর্যন্ত খরচ করা হয়। এর ফলে নতুনদের জন্য রাজনীতির দরজা সংকুচিতই থেকে যাচ্ছে।

এ অবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং নেপালে উজ্যালো নেপাল পার্টির মতো ছাত্রনেতৃত্বাধীন ও সংস্কারপন্থি নতুন দলগুলো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে আবির্ভূত হয়েছে। তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—২০২৬ সালের আসন্ন নির্বাচনগুলো কি সত্যিই পৃষ্ঠপোষকতা ও স্বজনপ্রীতির এই চক্র ভাঙতে পারবে, নাকি কেবল একদল ক্ষমতাবানকে সরিয়ে আরেকদল ক্ষমতাবানের উত্থান ঘটাবে? দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তবে এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের তুলনায় নেপালের নির্বাচন এখনো মোটামুটি অন্তর্ভুক্তিমূলক। সেখানে কোনো দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের বাইরে রাখা হয়নি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি। বিপরীতে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করা আওয়ামী লীগ কার্যত নির্বাচনের বাইরে থাকায় ফেব্রুয়ারির নির্বাচন চরিত্রগতভাবে ভিন্ন হয়ে উঠেছে। এ কারণে অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের মতে, নেপালের তুলনায় বাংলাদেশের নির্বাচন পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়।

এই পার্থক্য নেপালে বাংলাদেশের নির্বাচনকে একটি নেতিবাচক তুলনা হিসেবে তুলে ধরতে পারে—যেখানে প্রতিবাদ থেকে রাজনৈতিক রূপান্তর অংশগ্রহণের বদলে বর্জনে পরিণত হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে সীমান্তপারের রাজনীতি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচন কেবল প্রতিবেশী দেশের ঘটনা নয়; বরং রাজ্য রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তৃণমূল কংগ্রেস নিজেকে বিজেপির বিস্তার রুখে দেওয়া শেষ পূর্বাঞ্চলীয় দুর্গ হিসেবে তুলে ধরে। অপরদিকে বিজেপি বাংলাদেশ ইস্যুকে সামনে রেখে অনুপ্রবেশ ও নাগরিকত্বের প্রশ্নে আক্রমণ শানায়।

সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন এবং অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে যেকোনো অস্থিরতা বা সহিংসতার খবর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

আসামে পরিচয় ও অস্তিত্বের প্রশ্ন

আসামে বাংলাদেশের প্রভাব আরও গভীর ও ঐতিহাসিক। অভিবাসন, পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক টিকে থাকার প্রশ্ন বহু দশক ধরে রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গ টেনে সীমান্ত নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের প্রশ্ন তুলছেন।

এ অবস্থায় অভিবাসন, পরিচয় ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের আশঙ্কাগুলো আরও জোরালো হবে, নাকি সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে—বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফল আসামে এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবেই দেখা হবে।

‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ ও ভারতের প্রভাব

এই পুরো প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতি। তিনি ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ সরকার তার প্রত্যর্পণ চাইলেও নয়াদিল্লি তা মানেনি।

এ বিষয়টি বাংলাদেশের তরুণ আন্দোলনকারীদের কাছে বিদেশি প্রভাবের প্রতীক হয়ে উঠেছে এবং একই সঙ্গে ভারতীয় রাজনীতিতেও বিতর্ক তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে এটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা প্রশ্নে বিজেপির বয়ানকে শক্তিশালী করছে, আর নেপালের জন্য এটি হয়ে উঠছে আঞ্চলিক আধিপত্যের এক সতর্ক উদাহরণ।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের নির্বাচন শুধু একটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বরং দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে রাজনৈতিক আখ্যান কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তার এক বড় পরীক্ষাও হয়ে উঠছে।

লেখক: রুদাবেহ শহীদ, আটলান্টিক কাউন্সিলের সাউথ এশিয়া সেন্টারের ননরেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো এবং ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারবিষয়ক ভিজিটিং সহকারী অধ্যাপক।

সূত্র: আটলান্টিক কাউন্সিলকেএএ/