চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ১৮ বা ১৯ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে পারে রমজান মাস। রোজার ভোগ্যপণ্য আমদানি-মজুতে এবার ভালো অগ্রগতি ছিল। আভাস মিলছিল পণ্যের দামে এবার স্বস্তি থাকবে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন ঘিরে দেখা দিয়েছে নতুন আশঙ্কা।
কাগজে-কলমে মাত্র দুই সপ্তাহ সামনে থাকলেও ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দুদিনের ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটিসহ টানা চারদিন বন্ধের কারণে রোজার আগে দুই সপ্তাহে কর্মদিবস রয়েছে মাত্র সাতদিন। এর মধ্যে সপ্তাহের শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে ভোগ্যপণ্যের চেইনে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটবে। এতে ছোলা, ডাল, তেল, চিনি, খেজুরের মতো পণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ভোক্তা সংগঠনগুলো মনে করছে, বন্দর সংকটকে পুঁজি করে কতিপয় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। এতে সাধারণ ভোক্তারা বিপাকে পড়বেন। পাশাপাশি বন্দরের বর্তমান আন্দোলনকে অযৌক্তিক দাবি করে ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার রোজার আগেই দায়িত্ব হস্তান্তর করার ঘোষণা দিয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা চাইলে নির্বাচিত সরকার এলে আন্দোলন করতে পারতেন। এক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকার তাদের দাবির বিষয়ে চিন্তা করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সে সুযোগ নেই।’
কেমন জানি মনে হচ্ছে- রমজান সামনে রেখে পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করার জন্য একটি চক্র কাজ করছে। নানান সংস্থার ইন্ধনও থাকতে পারে এ আন্দোলনে। রোজা সামনে রেখে বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকলে পণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাজার অস্থির হবে, দাম বাড়বে।-ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল কবীর সুজন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত সপ্তাহের পুরোটা বন্দরের সংকটের কারণে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের জট তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আর মাত্র কয়েকদিন পরে রোজা। রোজায় এমনিতে কিছু পণ্যের চাহিদা থাকে। ইতোমধ্যে রোজার জন্য আমদানি করা অনেক পণ্য চলে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এখন কয়েকটি জাহাজ ভোজ্যপণ্য নিয়ে খালাসের জন্য অবস্থান করছে।’
তিনি বলেন, ‘রোববার থেকে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডেকেছে শ্রমিক কর্মচারীরা। শ্রমিকদের ঘোষণা অনুযায়ী রোববার বহির্নোঙরেও তারা কাজ বন্ধ রাখবে। যেটি আগের কোনো আন্দোলনে বহির্নোঙরে কাজ বন্ধ থাকেনি।’
বহির্নোঙরে কাজ বন্ধ থাকলে বাল্কপণ্য খালাস করতে না পারলে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়বে- এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রোজার পণ্যের সরবরাহ চেইনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাবে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপর। পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার চাপটা সাধারণ মানুষকে পোহাতে হবে।’
বন্দরে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস আরও এক সপ্তাহ পিছিয়ে গেছে। গত সপ্তাহেও অনেক জাহাজ থেকে খেজুরসহ আমদানি করা ফল খালাস করা সম্ভব হয়নি। এ সপ্তাহের শুরুতে খালাস বন্ধ হলে রোজার আগে ফলের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।-চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম
দেশে ভোগ্যপণ্যে দ্বিতীয় বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। খাতুনগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের বেশিরভাগ জেলায় ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ হয়। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা ভোগ্যপণ্যের বড় অংশ বেচাকেনা হয় খাতুনগঞ্জে।
খাতুনগঞ্জের মসলা ও ডালজাতীয় পণ্যের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেকান্দর জাগো নিউজকে বলেন, ‘বন্দরে শ্রমিকদের আন্দোলনে গত শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পণ্য খালাস বন্ধ ছিল। এতে আমদানি করা ভোগ্যপণ্যের দামে প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে ছোলা, মটরসহ রোজার প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। রোববার থেকে পুনরায় ধর্মঘট শুরু হলে সামনে রোজার বাজারে স্বাভাবিকভাবে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। দাম বাড়ার প্রভাব সাধারণ মানুষের ঘাড়ে গিয়ে পড়বে। বিশেষ করে কম আয়ের মানুষদের রোজায় নতুন ভোগান্তিতে পড়তে হবে।’
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘খাতুনগঞ্জে কাজ করা শ্রমিকদের বেশিরভাগ ভোলা, বরিশাল, বাগেরহাট অঞ্চলের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে শ্রমিকরা নিজ নিজ এলাকায় চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে খাতুনগঞ্জে বেচাকেনা কমছে। তবে বন্দরের সংকটে আমদানি করা পণ্য খালাস ব্যাহত হলে, বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য খালাস বিঘ্নিত হলে বাজারে দাম বাড়বে। যেহেতু রোজার আগের দু-একদিন চাহিদা ও বেচাকেনা বেশি থাকে। তখন সরবরাহ কম হলে দাম দ্রুত বেড়ে যাবে।’
আরও পড়ুনচট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা দূরে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ দাবিচট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা, পণ্য খালাস নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগআটকে আছে ৫১ হাজার কনটেইনার, গভীর সংকটে ব্যবসা-বাণিজ্য
রমজানে খেজুরের চাহিদাও বেশি থাকে। দেশের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। বন্দরে অপারেশনাল কাজ বন্ধ থাকলে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা সম্ভব না হলে খেজুরের বাজারও প্রভাবিত হবে। ইতোমধ্যে পাইকারিতে প্রায় সব ধরনের খেজুরের দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়েছে।
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বন্দরে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস আরও এক সপ্তাহ পিছিয়ে গেছে। গত সপ্তাহেও অনেক জাহাজ থেকে খেজুরসহ আমদানি করা ফল খালাস করা সম্ভব হয়নি। এ সপ্তাহের শুরুতে খালাস বন্ধ হলে রোজার আগে ফলের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। গত সপ্তাহের সংকটে এমনিতে ফলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। পাইকারিতে খেজুরে কেজিপ্রতি ১০-২০ টাকা বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমদানি করা ফল নির্ধারিত সময়ে বাজারে না এলে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহে সংকট তৈরি হবে, দাম বাড়বে সত্য। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পরে বাজারে এলে তখন চাহিদা থাকবে না। ফলে আমদানিকারকরা লোকসানের মুখে পড়বেন।’ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘কেমন জানি মনে হচ্ছে- রমজান সামনে রেখে পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করার জন্য একটি চক্র কাজ করছে। নানান সংস্থার ইন্ধনও থাকতে পারে এ আন্দোলনে। রোজা সামনে রেখে বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকলে পণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাজার অস্থির হবে, দাম বাড়বে। এ সুযোগে যেসব ব্যবসায়ীর গুদামে পণ্য মজুত রয়েছে, তাদের অনেকে দাম বাড়িয়ে দেবে। কারণ অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ খোঁজে। বন্দরের আন্দোলন তাদের সামনে সে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।’
এদিকে গত সপ্তাহের শুরুতে শনিবার থেকে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে ৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি শুরু করলেও সোমবার থেকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা এবং মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির কর্মসূচি আসে। বৃহস্পতিবার উপদেষ্টার আশ্বাসে ধর্মঘট দুদিন স্থগিত করেন শ্রমিক কর্মচারীরা। দুদিন পেরোতেই শনিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে চার দাবি জানিয়ে রোববার থেকে ফের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেয় বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের ব্যানারে এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা মো. হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহীম খোকন।
দাবিগুলো হচ্ছে- নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ না দেওয়ার সুস্পষ্ট সরকারি ঘোষণা, বন্দর চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামানকে বন্দরের চেয়ারম্যান পদ থেকে প্রত্যাহার, আন্দোলনে যেসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতিসহ নানাবিধ শাস্তিমূলক যে ব্যবস্থা নিয়েছে, তা বাতিল করে প্রত্যেক কর্মচারীকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিজ নিজ পদে পুনর্বহাল এবং আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনোরূপ মামলাসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।
এমডিআইএইচ/এএসএ/এএসএম