জাপানে পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। রোববারের (৮ ফেব্রুয়ারি) এই আগাম নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল জোট বড় ধরনের বিজয় পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভোটের মাধ্যমে নতুন ম্যান্ডেট নিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি ও কঠোর অভিবাসন নীতিসহ উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চান তাকাইচি। জনমত জরিপ অনুযায়ী, তাকাইচির লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) ও জাপান ইনোভেশন পার্টি বা ইশিনের জোট পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ৪৬৫ আসনের মধ্যে ৩০০টিরও বেশি আসন পেতে পারে। বর্তমানে জোটটি ২৩৩টি আসন ধরে রেখেছে।
বিপরীতে বিরোধী দলগুলো নতুন একটি মধ্যপন্থি জোট গঠন ও কট্টর ডানপন্থিদের উত্থান সত্ত্বেও কার্যকর চ্যালেঞ্জ গড়ে তুলতে পারছে না বলে মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন>>জাপানে নির্বাচন: তাকাইচিকে ট্রাম্পের পূর্ণ সমর্থনসংসদ ভেঙে দিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচিচীনে গিয়ে গোপন তথ্যে ভরা মোবাইল ফোন হারালেন জাপানি কর্মকর্তা
৬৪ বছর বয়সী তাকাইচি জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। গত অক্টোবরে এলডিপির নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। ‘কাজ, কাজ, কাজ’—এই স্লোগানে প্রচার চালানো এই অতিরক্ষণশীল নেত্রীর দৃঢ় রাজনৈতিক ভঙ্গি তরুণ ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এলডিপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পদত্যাগ করবেন।
ভোটগ্রহণ ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটরোববার ২৮৯টি একক আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করা হচ্ছে। বাকি আসনগুলো দলীয় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। স্থানীয় সময় রাত ৮টায় ভোটগ্রহণ শেষ হবে, এরপরই এক্সিট পোলের ভিত্তিতে প্রাথমিক ফল প্রকাশ শুরু হওয়ার কথা।
জাপানে এবারের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। মূল্যস্ফীতি বাড়লেও প্রকৃত মজুরি সেই হারে বাড়ছে না, ফলে সাধারণ মানুষ আর্থিক চাপে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরেই ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সমস্যায় ভুগছে জাপান। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর দেশটির অর্থনীতি বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে তাকাইচি খাদ্যপণ্যে আট শতাংশ বিক্রয়কর দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর আগে গত বছর কোভিড-১৯ মহামারির পর সবচেয়ে বড় প্রণোদনা প্যাকেজ অনুমোদন দেয় জাপান সরকার। ২১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনের এই প্যাকেজে জ্বালানি বিল ভর্তুকি, নগদ সহায়তা ও খাদ্য ভাউচারের মতো ব্যবস্থা রাখা হয়।
ডিসেম্বরের মধ্যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতি পুনর্বিবেচনার অঙ্গীকারও করেছেন তাকাইচি। এর আওতায় অস্ত্র রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী নীতির সীমা ছাড়িয়ে আরও আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি সম্পত্তির মালিকানা ও বিদেশি বাসিন্দাদের সংখ্যায় সীমা আরোপসহ কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি।
আল জাজিরার টোকিও প্রতিনিধি প্যাট্রিক ফক জানিয়েছেন, ৩০ বছরের কম বয়সী ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয় তাকাইচি তার ব্যাপক সমর্থন কাজে লাগিয়ে ভূমিধস জয় পেতে চান। কয়েক মাস আগেও দুর্নীতি কেলেঙ্কারি ও সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর কারণে এলডিপি সংকটে ছিল, তবে তাকাইচির নেতৃত্বেই দলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পররাষ্ট্রনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রতাকাইচির জোট বড় জয় পেলে জাপানের পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক স্টিফেন নাগি বলেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের জোট আরও জোরদার হবে এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততার পাশাপাশি প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা নীতিতে ভারসাম্য আনার সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকাইচিকে সমর্থন দিয়েছেন। এটি একদিকে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে জাপান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সূত্র: আল-জাজিরাকেএএ/