বৈচিত্র্য কখনো দুর্বলতা নয় সঠিক পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব পেলে তা-ই হয়ে উঠতে পারে উন্নয়নের প্রধান শক্তি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়া তার উজ্জ্বল উদাহরণ। ভৌগোলিক, জাতিগত, ধর্মীয় ও ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্পদে রূপান্তর করে দেশটি আজ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাতারে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।
মালয়েশিয়া মূলত দুটি ভৌগোলিক অঞ্চলে বিভক্ত। পেনিনসুলার মালয়েশিয়া এবং বোর্নিও মালয়েশিয়া (সাবাহ ও সারাওয়াক)। এই দুই অঞ্চলের মাঝখানে বিস্তৃত বিশাল সাউথ চায়না সাগর। আকাশপথে প্রায় দুই ঘণ্টার দূরত্ব হলেও স্থলপথে সরাসরি যোগাযোগ নেই। ভৌগোলিক এই বিভাজনের পাশাপাশি দেশটিতে বসবাস করছে মালয়, চাইনিজ, ইন্ডিয়ান (তামিল), ইবানিজসহ অসংখ্য জাতিগোষ্ঠী। রয়েছে ইসলাম, বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও বহু ভাষার মানুষের সহাবস্থান। এতসব বৈচিত্র্য সত্ত্বেও মালয়েশিয়া আজ একটি শক্তিশালী অর্থনীতি, উন্নত অবকাঠামো এবং বিশ্বপর্যটকদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য।
১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর দীর্ঘ সময় মালয়েশিয়া একটি দরিদ্র দেশ হিসেবেই পরিচিত ছিল। মালয়, চাইনিজ ও তামিল রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত জোট সরকার দেশ পরিচালনা করলেও নাগরিক আচরণ, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অনিয়ম উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সত্তরের দশক পর্যন্ত দেশটির অগ্রগতি ছিল ধীর।
এই বাস্তবতায় পরিবর্তনের সূচনা ঘটে আশির দশকে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানসিক রূপান্তর এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মধ্য দিয়েই মালয়েশিয়া ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। এর সবচেয়ে বড় মাইলফলক ছিল ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির বিন মোহাম্মদের প্রণীত ‘ভিশন ২০২০’। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়াকে একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নত দেশে রূপান্তর করা।
ভিশন ২০২০ বাস্তবায়নের অন্যতম ভিত্তি ছিল শিক্ষা ও নাগরিক আচরণের সংস্কার। ডা. মাহাথির তার আত্মজীবনী Doctor in the House-এ উল্লেখ করেন, সরকারি সম্পদ অপব্যবহার, দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতিপ্রবণ আচরণ উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। তাই তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সরাসরি নিজের অধীনে নিয়ে আমূল সংস্কারে হাত দেন।
মালয়েশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় এমন একটি ভারসাম্য আনা হয়, যেখানে মুসলিম মালয়রা যেমন আরবি পড়তে ও লিখতে পারে, তেমনি চাইনিজ ও তামিল নাগরিকরা নিজ নিজ ভাষা ও বর্ণে শিক্ষালাভের সুযোগ পায়। আন্তর্জাতিক মানের সিলেবাস প্রণয়নের পাশাপাশি উপযুক্ত শিক্ষক তৈরিতে জোর দেওয়া হয়।
এর পাশাপাশি চালু হয় নাগরিক আচরণ গঠনের প্রশিক্ষণ—যা ছিল এক ধরনের নীরব সামাজিক বিপ্লব। এ লক্ষ্যে কিছু আমলাকে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয় মানব আচরণ ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করাতে। দেশে ফিরে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে আচরণগত প্রশিক্ষক তৈরি করেন।
ওয়েলকামিং নেশন: দেশি-বিদেশি সবাইকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানো। স্মাইল নেশন: হাসিমুখে কথা বলা, রাগ বা বিরক্তি প্রকাশ না করা। হেলপিং নেশন: সম্মানের সঙ্গে অন্যকে সহযোগিতা করা। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা: সরকারি সম্পদ নষ্ট না করা ও দায়িত্বশীল ব্যবহার। আশঙ্কা ছিল, অনেক শিক্ষক ও আমলা এ ধরনের প্রশিক্ষণ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। কিন্তু ইতিবাচক ফল আসায় বড় ধরনের কোনো বিরোধিতা দেখা যায়নি। আজকের মালয়েশিয়ার শৃঙ্খলাবোধ, সৌজন্য ও অতিথিপরায়ণতার পেছনে এই সংস্কারের বড় ভূমিকা রয়েছে।
মালয়েশিয়ার উন্নয়নের আরেকটি বড় শক্তি হলো জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রীতি। ভূমিপুত্র মালয়, চাইনিজ ও তামিল-এই তিন বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী একই সঙ্গে বসবাস করছে, কাজ করছে, রাজনীতি ও অর্থনীতি পরিচালনা করছে। অফিস, বাজার, কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-সবখানেই তাদের সহাবস্থান চোখে পড়ে।
সংবিধান অনুযায়ী ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও সব ধর্মের পূর্ণ স্বীকৃতি রয়েছে। দেশের প্রায় ৬৩ শতাংশ মুসলমান হলেও হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় নির্বিঘ্নে ধর্ম পালন করছে। কিছু প্রদেশে শরিয়া আইন কার্যকর থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সবাই অংশগ্রহণ করছে।
সাবাহ ও সারাওয়াক প্রদেশ এই বৈচিত্র্যের আরেক অনন্য উদাহরণ। এখানে ইবানিজ জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি, পাশাপাশি চাইনিজ ও তামিল জনগোষ্ঠীও রয়েছে। সাংবিধানিকভাবে এ দুই প্রদেশ বিশেষ মর্যাদা ও নিজস্ব ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা ভোগ করে, তবুও তারা ফেডারেল মালয়েশিয়ার উন্নয়নের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে চলছে।
ধর্মীয় উগ্রতা ও সংঘাত এড়াতে মালয়েশিয়া একটি সুসমন্বিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীনে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় শরিয়া কাউন্সিল রয়েছে। মসজিদ স্থাপন করতে সরকারি অনুমতি লাগে, মসজিদ কমিটিতে নারী-পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয় এবং শুক্রবারের খুতবা কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত—যেন বিভ্রান্তি বা উসকানি না ছড়ায়। মসজিদগুলো শুধু ইবাদতের স্থান নয়, সামাজিক কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
একইভাবে সারাদেশে অসংখ্য মন্দির, চাইনিজ টেম্পল ও চার্চ রয়েছে। সব ধর্মের প্রধান উৎসব উপলক্ষে সরকারিভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়। ধর্মীয় বাস্তবতার কারণে কিছু প্রদেশে শুক্রবার-শনিবার এবং অন্যগুলোতে শনিবার-রোববার সাপ্তাহিক ছুটি চালু আছে—ফলে অনেক ক্ষেত্রে তিন দিনের সাপ্তাহিক ছুটিও দেখা যায়।
একজন অধ্যাপকের মতে, ধর্মীয় সম্প্রীতি, নাগরিক আচরণ, শিক্ষা পদ্ধতি ও উন্নয়ন নীতিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তিনি বলেন, নাগরিক আচরণ নেতিবাচক হলে তার প্রভাব দেশ ও বিদেশ-দুই জায়গাতেই পড়ে। মালয়েশিয়া আগে নাগরিক আচরণ ঠিক করেছে, পরে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে।
নব্বইয়ের দশকে অর্থনৈতিক সংকটে মালয়েশিয়াকে রাস্তার বাতি নিভিয়ে রাখতে হলেও আজ সেই দেশ আলোর ঝলকানিতে বিশ্বকে আকৃষ্ট করছে। যেখানে মালয়েশিয়া পরিকল্পিত শিক্ষা সংস্কার ও আচরণগত উন্নয়ন করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রথাগত ও অসংগঠিত ব্যবস্থার মধ্যেই রয়ে গেছে।
প্রবাসী সুহেল তালুকদারের মতে, ডা. মাহাথির বিন মোহাম্মদের মতো শক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও স্পষ্ট কমিটমেন্টই মালয়েশিয়াকে এগিয়ে নিয়েছে। তাই বাংলাদেশকে মালয়েশিয়ার সঙ্গে তুলনা করতে হলে স্লোগান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার দিকেই নজর দিতে হবে।
মালয়েশিয়ার উন্নয়নের গল্প প্রমাণ করে-বৈচিত্র্য সমস্যা নয়, বরং সঠিক নেতৃত্ব, নীতি ও নাগরিক আচরণের মাধ্যমে তা জাতির সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে। জাতি, ধর্ম ও ভাষার সহাবস্থানে গড়ে ওঠা এই দেশ আজ উন্নয়নের এক অনুকরণীয় মডেল।
এমআরএম/এমএস