প্রবাস

একটি বাংলাদেশ আমি জাগ্রত জনতার

আমার নাম এখন বাংলাদেশ। আমি শুধু এক ভূখণ্ড নয়, এক জীবন্ত ইতিহাস, এক ভাষার মেলবন্ধন, এক জাতির আত্মপরিচয়। শুরুটা হয়েছিল বহু প্রজন্ম আগে, যখন আমার মাটিতে ছোট ছোট রাজ্য, স্থানীয় নবাব ও রাজাদের শাসন চলত। সেই সময়ে আমার মানুষেরা কল্পনা করত, একদিন তাদের মাটি, নদী, পাহাড় ও গ্রাম একত্র হয়ে এক পরিচিত নাম পাবে, যা তাদের স্বাধীনতা, শক্তি এবং গর্বের প্রতীক হবে।

ভাষা বাংলা আমার প্রাণের ভিত, আমার আত্মার সুর। এই ভাষা তৈরি হয়েছে গ্রামের মাটির সঙ্গে, নদীর কলকল, কণ্ঠস্বর, বাজারের হাহাকার ও স্কুলের পাঠশালার শব্দে। প্রতিটি শব্দে আমার সন্তানের চেতনা, তাদের হাসি, তাদের কান্না প্রতিফলিত হয়েছে। ভাষার এই ধারায়ই গড়ে উঠেছে আমার সাংস্কৃতিক ভিত্তি, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রক্ষা পেয়েছে।

দেশও বাংলা। আমার ভূখণ্ড, নদী, খাল, পাহাড় সবই একাকার হয়ে গড়ে তুলেছে আমার জাতীয় পরিচয়। কী চমৎকার। এই নাম, এই পরিচয়, এই গর্ব আমি পেয়েছি আমার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে। তাদের মধ্যে ছিলেন সাহসী কৃষক, চতুর বণিক, সাহসী সৈনিক, বিদ্বান পণ্ডিত, কবি ও শিক্ষক। তারা আমার মাটি, ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য লড়েছিল, কখনো জীবন উৎসর্গ করেছিল। তাদের ত্যাগ, ধৈর্য এবং দৃষ্টিভঙ্গিই আমাকে আজকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

কিন্তু এই নাম, এই দেশ, এই সংস্কৃতি সহজে তৈরি হয়নি। শতাব্দীর শোষণ, বিদেশী শাসন, বিভাজন, দমন ও অত্যাচার সবই মোকাবিলা করতে হয়েছে। তারপরও আমার সন্তানরা কখনো হার মানেনি। সেকালে, নবাব সিরাজদৌলার সময়, তারা প্রথম বুঝেছিল স্বাধীনতার স্বাদ। তাদের মধ্যে অনেকেই নিজের রাজত্বের স্বার্থ ত্যাগ করে লড়েছিল, আমাকে বিদেশি শাসকের কব্জা থেকে মুক্ত করতে। সিরাজদৌলার প্রতিরোধ, ১৭৫৭ সালে প্লাসির যুদ্ধে হেরে যাওয়া, ছিল শোকের অধ্যায়। কিন্তু সেই হারের মধ্যেই জন্ম নিয়েছিল প্রতিরোধের বীজ, যা ভবিষ্যতের সংগ্রামের ভিত্তি রচনা করে।

এরপর এ অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসন শুরু হলো। করবাজি, শোষণ, গ্রাম বাংলার মানুষের ওপর নেমে এসেছে নির্যাতন। সাধারণ মানুষের জীবন সীমাবদ্ধ ছিল খাদ্য, জীবনধারণ ও বেঁচে থাকা। তবু আমার সন্তানরা ধীরে ধীরে বুঝে নিল স্বাধীনতার জন্য শুধু ক্ষুধা নয়, সচেতনতা, সংহতি এবং সাহসও প্রয়োজন। তারা লড়াই করল চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী থেকে রণাঙ্গনের সৈনিক, গ্রামে গ্রামে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, যা সমগ্র ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রারম্ভ, আমাকে দেখায় যে আমার সন্তানদের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও সাহস কখনো নিভেনি। তার পরেও বাঙালির শিক্ষা ও সংস্কৃতি দমন করা হয়েছে। কলেজ, পাঠশালা, মসজিদ, মন্দির, নদী সব কিছুতেই আমার সন্তানরা লুকিয়ে রেখেছিল জ্ঞানের দীপ্তি। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, আল্লামা ইকবাল, নজরুল ইসলাম তাদের চিন্তাধারা আমার সন্তানদের মনের প্রতিফলন হয়ে উঠেছিল, তাদের সাহস ও স্বপ্নের চিহ্ন হয়ে রইল।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাজনের দুঃখ, যখন পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়ে গেলো, ছিল আমার হৃদয়ে গভীর আঘাত। হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হলো, আতঙ্ক ও লাঞ্ছনার মুখোমুখি হলো। সেই সময়ের প্রতিটি কান্না, প্রতিটি বেদনা আমার মাটিকে কেঁদেছিল। তারপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এটি ছিল সেকালের চূড়ান্ত অধ্যায়। আমার সন্তানরা আমাকে রক্ষা করতে প্রাণের ত্যাগ করল। রক্তের বিনিময়ে, অগ্নির মধ্য দিয়ে, তারা আমাকে স্বাধীনতার আলো দেখিয়েছে। শহর, গ্রাম, নদী, পাহাড় সকলেই তাদের ত্যাগের সাক্ষী।

আমি ভেবেছিলাম বাকি জীবনটি সুখে কাটাব। আমার কাছে তো সবই আছে উর্বর মাটি, নদীর কলতান, কাজের লোক, সূর্যের হাসি আর আকাশের বিশালতা। আমার সন্তানরা যা রোপণ করছে, তার ফলেই ঘ্রাণ ছড়ায় ফসলের আমার বুক থেকে উঠে আসা উর্বরতার আশীর্বাদ। আমি পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে মানুষ, শ্রম, স্বপ্ন সব মিলিয়ে ফলাতে পারে যা ইচ্ছে। সবাই বলে আমি সোনার বাংলা, বহু দেশের রাণী আমাকে আখ্যায়িত করেছে। আমি শুরু করেছিলাম আশার আলো নিয়ে এক উন্নত সমাজ গঠনের জন্য, যেখানে ন্যায়, শিক্ষা, সুযোগ এবং মানবিক মর্যাদা সমানভাবে ছড়িয়ে থাকবে, যেখানে প্রত্যেক শিশুর চোখে থাকত আলো, প্রতিটি হৃদয় পূর্ণ হতো আশা আর সম্ভাবনার সঙ্গে।

কিন্তু কী চেয়েছিলাম আর কী হচ্ছে। আজ ৫৫ বছর কেটে গেছে। কোথায় সেই উন্নত সমাজ। আমার সন্তানরা এখন আমার বুকে বিষ ঢালছে। তারা আমার উর্বরতাকে ক্ষয় করছে, আমার কর্মক্ষমতা নষ্ট করছে। আমার ভূমিতে বাস করা মানুষদের মধ্যে বিভেদ, হিংসা এবং স্বার্থপরতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুদের উপেক্ষা করা হচ্ছে, অন্যদের প্রতি ঘৃণার বিষ বপন করা হচ্ছে। তারা আমার নামের ওপর কলঙ্কের ছাপ ফেলছে, বিশ্ব আমাকে কলঙ্কিনী বলছে।

আমার সন্তানদের মধ্যে দুর্নীতি, বেকারত্ব, মেধা পাচার, বৈষম্য, দুর্বল শিক্ষা, আইন অমান্য, প্রকল্পে লুটপাট, দুর্বল স্বাস্থ্যখাত, দুর্বল কুটনীতি, জালিয়াতি, পরশ্রীকাতরতা, হিংসা সবই আজ ছড়িয়ে আছে। তারা নিজের বিপদে বলে আল্লাহ পরীক্ষা নিচ্ছেন, অন্যের বিপদে বলে অপকর্মের শাস্তি হচ্ছে। এই দ্বৈত মানদণ্ডের কারণে সমাজে নৈতিকতা হারাচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি, ভালো শিক্ষক তৈরি না করার ব্যর্থতা, শিশু ও যুবকের মনকে দিশাহীন করছে। সব মিলিয়ে সমাজের হৃদয় কাঁপছে, স্বপ্নগুলো লজ্জায় লুকিয়ে যাচ্ছে।

আমার হৃদয় বিষাদে ভরা, কিন্তু আমি এখনও আশা হারাইনি। আমি চাই আমার সন্তানরা নিজের ভুল বুঝুক, সচেতন হোক, সুশিক্ষা গ্রহণ করুক, নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে দায়িত্বশীল হোক। আমি চাই তারা নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা স্থাপন করুক, ঘৃণার বিষ দূর করুক। আমি চাই তারা নিজেরাই শক্তিশালী ও আত্মনির্ভর হয়ে আমার জন্য গর্বের প্রতীক হোক। তারা পেরেছিল এক স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে নতুন গণতন্ত্রের জন্ম দিতে, কিন্তু দীর্ঘ ১৮ মাসের কঠিন সময় অতিক্রম করে তারা এখন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে।

আমি চাই সেই বাংলাদেশ, যেখানে নির্বাচনের প্রতিটি পদক্ষেপ মানুষের অধিকার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে। যেখানে ভয় আর হতাশা নয়, সাহস আর বিশ্বাসের রাজত্ব থাকবে। আমি চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজের ভূমি ও স্বপ্নের অধিকার অনুভব করবে। যেখানে আশা, শিক্ষা, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদা আমার সন্তানেরা আবারো পূর্ণতার সঙ্গে জীবিত করবে।

আমি চাই সেই বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি ভোর নতুন সূর্য নিয়ে আসে, যেখানে রাতের অন্যায় ও অন্ধকার ভেঙে দিনের আলো মানুষের মুখে আলো ছড়ায়। যেখানে মানুষের হৃদয় আলোকিত হয়, কেবল আশা নয়, বরং শক্তি ও দৃঢ়তার আলো ছড়ায়। আমি চাই সেই বাংলাদেশ, যেখানে মানুষ শুধু স্লোগান বা শব্দের জন্য নয়, বিবেকের আগুন জ্বালিয়ে প্রতিজ্ঞা রচনা করছে এবং সেই সত্যিই দেখাচ্ছে পথের দিশা। যেখানে ক্ষুধার কান্না থেমে যায়, কৃষকের ঘামে জন্ম নেয় সম্মান, এবং শ্রমিকের হাতে তুলে দেয়া হয় আগামী দিনের পতাকা, যা সব প্রজন্মের জন্য গর্বের প্রতীক।

আমি চাই সেই বাংলাদেশ, যেখানে তরুণদের চোখে থাকবে না ভয়। তারা স্বপ্নের ডানা মেলে উড়বে দূর আকাশে, নিজেদের প্রশ্ন করার সাহসকে শক্তির প্রতীক হিসেবে নিয়ে যাবে। যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের ক্ষমতা মাথানত করবে, যেখানে আইন হবে ন্যায়বিচারের নির্ভুল প্রতিচ্ছবি, আর রাষ্ট্র হবে সবার জন্য সুরক্ষিত, সকলের আপন ঘর।

আমি চাই সেই বাংলাদেশ, যা নদীর মতো উদার, মাটির মতো ধৈর্যশীল, মানুষের মতো গভীর মানবিক। যেখানে সততা, মানবতা ও ন্যায়ের মানচিত্রে কোনো দুর্নীতি থাকবে না, শুধুই গল্পের বইয়ে থাকবে তার স্মৃতি। যেখানে যারাই জন্ম নিক, যে ঘরেই আলো জ্বলে উঠুক, কেউ তাকে তাড়াবে না, কেউ বলবে না, তুমি এখানে নও। যেখানে ধর্ম, ভাষা বা পরিচয়ের সব দেওয়াল ভেঙে মানুষ মানুষকে চিনবে, প্রতিটি পথ হবে তার নিজের ঠিকানা। সেই দেশে ভয়ের বদলে থাকবে আলিঙ্গন, প্রতিটি নবজাতকের কান্না হবে নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রথম সুর, এবং মানুষের মধ্যে ফিরে আসবে বিশ্বাস, ভালোবাসা, অহংকার ও মর্যাদার সমন্বয়।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com

এমআরএম