জাতীয়

অপরাধীদের আতুরঘর মোহাম্মদপুরে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে তবু ‘শঙ্কা’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা কাটছে না অপরাধীদের আতুরঘর খ্যাত মোহাম্মদপুরবাসীর। নির্বাচন সামনে রেখে অপরাধ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক প্রচারণায় সক্রিয়তা ও সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনা ভোটারদের ভাবাচ্ছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, শঙ্কা থাকলেও তারা সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে প্রস্তুত।

নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসেবে রাজধানীর শ্যামলী ফুটওভার ব্রিজে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ব্যানার টাঙানোর ঘটনায় আলোচনায় আসেন পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তিনি জোড়া খুনের মামলার আসামি। বর্তমানে পলাতক। বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে বলে জানিয়েছেন তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান।

মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক সহিংস ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন স্থানীয়রা। গত ১৪ নভেম্বর পুলিশের অভিযানে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে ককটেল তৈরির কারখানার সন্ধান পায়। এসময় ৩৫টি তাজা ককটেল ও বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এর আগে একই এলাকায় মাদক কারবারিদের গুলিবিনিময়ে শিশুসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন।

চলতি বছরের আগস্টে জেনেভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসার আধিপত্য কেন্দ্র করে শাহ আলম (২২) নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনায় স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধীরা এলাকায় দাপটের সঙ্গে চলাফেরা করলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

মোহাম্মদপুর একটি চিহ্নিত সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকা হওয়ায় নির্বাচনে নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আধিপত্য বিস্তারের কৌশলের ওপর নির্ভর করবে কতটা সন্ত্রাসী শক্তি ব্যবহার করা হবে।-নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী

ঢাকা-১৩ সংসদীয় আসনটি উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮ থেকে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। মোট ভোটার ৪ লাখ ৮ হাজারের বেশি। এ আসনের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে জেনেভা ক্যাম্প, যাকে স্থানীয়রা ‘অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।

আগামীকালের (১২ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনে এ আসনে একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন ববি হাজ্জাজ। রিকশা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন জামায়াত জোটের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মো. মামুনুল হক। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদ, বাসদসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও মাঠে রয়েছেন।

আরও পড়ুন

কড়া গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়ভোটের প্রস্তুতি সম্পন্ন, প্রত্যাশার চাপের সঙ্গে আছে চ্যালেঞ্জওভোটের আগেই মোহাম্মদপুরের দুষ্কৃতকারীদের সাইজ করা হয়েছে: পুলিশডেভিল হান্টে মোহাম্মদপুর-আদাবর থানা এলাকায় গ্রেফতার ২৫স্থানীয়রা বলছেন, স্বাভাবিক সময়েও মোহাম্মদপুরে চলাফেরা করতে আতঙ্কে থাকতে হয়। নির্বাচনের সময় যদি সন্ত্রাসীরা সহিংসতায় জড়ায়, তাহলে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নির্বাচনে কতটা নিরাপদ এই এলাকা? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, নির্বাচন কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের শঙ্কা দেখছেন না তারা। আবার সম্পূর্ণভাবে আশঙ্কা উড়িয়েও দিচ্ছে না। তবে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুত পুলিশ।

মোহাম্মদপুরের স্থানীয় বেশ কয়েকজন বাসিন্দা নির্বাচনে সন্ত্রাসী হামলার শঙ্কা প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আদাবরের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, মোহাম্মদপুরে দিনে-দুপুরে সংঘর্ষ লাগে। মার্ডার হয়। এই এলাকার যারা সন্ত্রাসী তাদের কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই। সব ধরনের অস্ত্র আছে এদের কাছে। সন্ত্রাসীর অভাব নেই এ এলাকায়। অভিযান করে বেশ কয়েকজনকে ধরেছেও। কিন্তু কতজনকে ধরবে। ধরতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা করে। ওপেন অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

তিনি বলেন, নির্বাচনে সবটাই শঙ্কা। সন্ত্রাসীরা যদি ভোটকেন্দ্র বা আশপাশের এলাকায় কোনো ঝামেলা করে তাহলে ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়া বা ভোট দেওয়া তো ঝামেলা। জীবন ঝুঁকি নিয়ে তো আর ভোট দিতে যাওয়া যাবে না।

দীর্ঘ আট বছর ধরে ঢাকা উদ্যানে বসবাস করা এক বাসিন্দা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, সরকার পতনের আগেও যেমন সন্ত্রাসী এলাকা ছিল, সরকার পতনের পর আরও বেড়েছে। দিনে-দুপুরে চুরি-ডাকাতি, ইভটিজিং ও খুনের মতো ঘটনায় এলাকাবাসী উদ্বিগ্ন। ভোটাররা কেন্দ্রে কীভাবে যাবে সে শঙ্কায় অনেকেই।

মোহাম্মদপুরের লিমিটেড এলাকার বাসিন্দা মো. শাহেদ আলম বলেন, নির্বাচন না, সাধারণ সময়েও মোহাম্মদপুরে দিনে রাস্তায় চলাচলে বেশ খানিকটা আতঙ্কে থাকতে হয়। নির্বাচনে কী পরিস্থিতি হবে সেটা এখনই বলতে পারি না।

পূর্ণশক্তি নিয়ে মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৫০ জন সদস্য মাঠে থাকবে। এর মধ্যে পুলিশ সদস্য থাকবে দেড় লাখ। এছাড়া সেনাবাহিনীর এক লাখ, নৌবাহিনীর পাঁচ হাজারের বেশি ও বিমানবাহিনীর সাড়ে তিন হাজারের বেশি। এছাড়া আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার সদস্য থাকবেন।

পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজারের বেশি, কোস্টগার্ডের সাড়ে তিন হাজারের বেশি, র‍্যাবের সাড়ে ৭ হাজারের বেশি এবং ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, আসন্ন নির্বাচনে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ২৫ হাজারের বেশি বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও ৫০০টি ড্রোন ব্যবহার করা হবে।

এক সপ্তাহে ২৫ সংঘাত

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করে প্রচারণা শুরুর পর এক সপ্তাহে ২৫টি সংঘাতের ঘটনা পাওয়া গেছে। গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণার প্রথম সাতদিনেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যার অধিকাংশই হয়েছে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে। এসব সংঘর্ষে একজন নিহতসহ আহত হয়েছেন দুই শতাধিক নেতাকর্মী।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তত ৫৪টি সহিংসতার ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪৯৪ জন এবং নিহত হয়েছেন তিনজন।

সংগঠনটি জানায়, প্রচারণা শুরুর আগে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩টি নির্বাচনি সংঘাতের ঘটনায় ১০৩ জন আহত ও একজন নিহত হয়েছেন।

পুলিশ যা বলছে

তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিসি) জুয়েল রানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘মোহাম্মদপুর নগরীর একটি আতঙ্কের নাম হলেও নির্বাচন কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কেউ কাউকে মারধর তো দূরের কথা, সামান্য সহিংসতাও হয়নি, যা এ এলাকার জন্য ব্যতিক্রমী।’

তিনি বলেন, সহিংসতার আশঙ্কা অবশ্যই আছে। তবে তা মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মোহাম্মদপুরকে তিনি ‘সর্পনগরী’ উল্লেখ করে বলেন, এই সাপের বিষদাঁত ভাঙার মতো সক্ষমতাও পুলিশের রয়েছে।

এডিসি জুয়েল রানা আরও বলেন, সব প্রার্থী ও প্রশাসনের সমন্বয়ে নির্বাচন পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি প্রার্থীর প্রচারণায় পুলিশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং যে কোনো অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রশাসনের লক্ষ্য, মোহাম্মদপুরে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেওয়া।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা কোনো ধরনের শঙ্কা দেখছি না। আমরা সতর্ক আছি।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, ‘মোহাম্মদপুর একটি চিহ্নিত সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকা হওয়ায় নির্বাচনে নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আধিপত্য বিস্তারের কৌশলের ওপর নির্ভর করবে কতটা সন্ত্রাসী শক্তি ব্যবহার করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা বা নিজের অনিয়ম ঢাকতে মাসল পাওয়ার ব্যবহারের প্রবণতা থাকে, যা নির্বাচনি সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের জন্যও নির্বাচনে অর্থনৈতিক লাভের সুযোগ তৈরি হয়।’

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে কার্যকর কমিটি গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এতে সামাজিক চাপ তৈরি হবে, যা সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কেআর/এএসএ